জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে ঘোষিত মৃত্যুদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বুধবার (২৬ নভেম্বর) তিন বিচারকের স্বাক্ষরের পর রায়ের নথি প্রকাশ করা হয়। নির্ধারিত আইন অনুযায়ী, এ দিন থেকেই ৩০ দিনের মধ্যে আপিলের সুযোগ রাখতে হলে আসামিদের আত্মসমর্পণ করতে হবে।
পরিস্থিতির সূচনায় জানা যায়, গত ১৭ নভেম্বর বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণা করে জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংগঠিত হত্যাকাণ্ড ও অন্যান্য নিষ্ঠুরতার দুই অভিযোগে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই মামলায় চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারপতি মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী এই রায়ে একমত হন।
ঘটনার পটভূমিতে উঠে এসেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয় এবং পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে প্রথম মামলাটি হয় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। ১৭ অক্টোবর মামলার প্রথম শুনানিতে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। পরে ১৬ মার্চ প্রসিকিউশনের আবেদনে সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে আসামি করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়ে ১২ মে এবং ১ জুন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয় পাঁচটি অভিযোগে। এই অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল উসকানিমূলক বক্তব্য, প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার, রংপুরে আবু সাঈদ হত্যা, চানখাঁরপুলে ছয়জন হত্যা ও আশুলিয়ায় ছয়জনকে পুড়িয়ে হত্যা।
রায়ের বিশদ বিবরণে উঠে এসেছে ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ। প্রথম অভিযোগে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য, হত্যার নির্দেশ এবং নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধে ব্যর্থতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ১৪ জুলাই গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনরত ছাত্র জনতাকে রাজাকার বলে সম্বোধন করা এবং ওই রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির সঙ্গে কথোপকথনে হামলার নির্দেশ দেওয়াকে রায় প্রভাবিতকারী গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করেছে আদালত। পরে ১৮ জুলাই তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে ফোনালাপে মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশও রায়ের ভিত্তি তৈরি করে।
অন্যদিকে চানখাঁরপুল ও আশুলিয়ার দুই ঘটনায় ছয়জন করে হত্যার অভিযোগে আসাদুজ্জামান খান কামালের ভূমিকা রায়ে উল্লেখ করে বলা হয়, তিনি অপরাধ সংঘটনে সহযোগিতা করেছেন ও দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। তাই উভয় ঘটনার জন্য তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
রাজসাক্ষী হিসেবে স্বীকারোক্তি দেওয়ায় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আদালত বলেছেন, তিনি ৩৬ দিনের আন্দোলনের বহু ঘটনার সত্যতা প্রকাশ করেছেন এবং আলামত উপস্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, ফলে তার ক্ষেত্রে নমনীয়তা দেখানো হয়েছে।
এই রায় ঘোষণার পর সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের প্রতিক্রিয়ায় জানা যায়, জুলাই আন্দোলনে নিহতদের পরিবার ও আন্দোলনকারী সংগঠনগুলো শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে দণ্ড কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন। তারা মামুনের স্বল্প সাজা নিয়ে অসন্তোষ জানান। রায়ে নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে সরকারের প্রতি নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
রায়ের পূর্ণাঙ্গ নথি প্রকাশের মধ্য দিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংক্রান্ত এই মামলায় বিচারপ্রক্রিয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হলো। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এটাই প্রথম রায় যা একজন সাবেক সরকারপ্রধান ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণ করেছে। আইনজীবীরা বলছেন, আপিল করতে চাইলে তাদের আত্মসমর্পণ করতেই হবে এবং রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীর পক্ষে আপিলের সুযোগ নেই।
নিজস্ব প্রতিনিধি 
























