আয়নায় নিজেকে দেখে কিংবা স্কেলে নিজের ওজন মাপার পর সবকিছু ঠিকঠাক মনে হলেও শরীরের ভেতরে নীরবে দানা বাঁধতে পারে মারাত্মক সব স্বাস্থ্যঝুঁকি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এর নাম ‘মেটাবোলিক সিনড্রোম’। এটি মূলত কোনো একক রোগ নয়, বরং বেশ কয়েকটি বিপাকজনিত বা মেটাবোলিক সমস্যার একটি বিপজ্জনক সংমিশ্রণ। আধুনিক ও ব্যস্ত জীবনযাত্রার কারণে বিশ্বজুড়ে এই নীরব ঘাতক সমস্যাটি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের তথ্যমতে, বর্তমানে প্রতি পাঁচজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে অন্তত একজন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই সিনড্রোমে আক্রান্ত অথবা এর উচ্চ ঝুঁকিতে অবস্থান করছেন।
মেটাবোলিক সিনড্রোম মূলত শরীরের ভেতরের বিপাকক্রিয়া বা মেটাবলিজম ধীর ও ত্রুটিপূর্ণ করে তোলে। চিকিৎসকদের মতে, প্রধানত পাঁচটি উপাদানের বা উপসর্গের মধ্যে অন্তত তিনটি একসঙ্গে উপস্থিত থাকলে তাকে মেটাবোলিক সিনড্রোম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই লক্ষণগুলো হলো—কোমরের চারপাশে অতিরিক্ত ও অস্বাভাবিক চর্বি জমে যাওয়া, উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা, খালি পেটে রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকা, রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া এবং ভালো কোলেস্টেরল বা এইচডিএল (HDL)-এর মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়া। এককভাবে এই সমস্যাগুলো হয়তো ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু যখন এগুলো একসঙ্গে শরীরে বাসা বাঁধে, তখন হৃদযন্ত্র থেকে শুরু করে কিডনি পর্যন্ত সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ মারাত্মক চাপের মুখে পড়ে।
এই বিপাকজনিত সমস্যা বৃদ্ধির পেছনে আমাদের আধুনিক জীবনযাত্রার বড় দায় রয়েছে। শহরকেন্দ্রিক ও অতি যান্ত্রিক জীবনযাপনে কায়িক পরিশ্রমের সুযোগ দিন দিন কমে আসছে। কর্মঘণ্টার সিংহভাগ সময় অফিসের ডেস্কে বসে কাটিয়ে দেওয়া, নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস না থাকা, লিফট বা আধুনিক যানবাহনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা শরীরের ক্যালেন্ডারভিত্তিক মেটাবলিজমকে নষ্ট করে দিচ্ছে। এর পাশাপাশি ফাস্টফুড, প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত চিনিযুক্ত কোমল পানীয় গ্রহণ, অনিয়মিত ঘুম এবং করপোরেট জীবনের দীর্ঘমেয়াদী মানসিক চাপ ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের জন্ম দিচ্ছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের কোষে ইনসুলিনের কার্যকারিতা হ্রাস পায়, ফলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে শরীর অতিরিক্ত ইনসুলিন তৈরি করতে বাধ্য হয় এবং দীর্ঘ মেয়াদে এই দুষ্টচক্র মেটাবোলিক সিনড্রোমের রূপ নেয়।
শুরুর দিকে মেটাবোলিক সিনড্রোমের কোনো স্পষ্ট বা দৃশ্যমান লক্ষণ প্রকাশ পায় না বলেই এটিকে নীরব ঘাতক বলা হয়। তবে শরীর নানাভাবে ছোটখাটো সংকেত দিতে শুরু করে। যেমন—কোমরের মাপ হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়া, সামান্য পরিশ্রমেই অতিরিক্ত ক্লান্তি অনুভব করা, রক্তচাপ বারবার স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পাওয়া, অথবা অনেক চেষ্টা করেও শরীরের ওজন বা মেদ কমানো সম্ভব না হওয়া। নারীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও কিছুটা বেশি থাকে। বিশেষ করে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস), গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ইতিহাস কিংবা মেনোপজ বা ঋতুনিবৃত্তির পরবর্তী সময়ে নারীদের বিপাকতন্ত্রে বড় পরিবর্তন আসে, যা এই ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
সময়মতো এই নীরব সমস্যা চিহ্নিত ও নিয়ন্ত্রণ করা না হলে তা টাইপ-২ ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, ফ্যাটি লিভার ডিজিজ এবং কিডনির মারাত্মক জটিলতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এমনকি রক্তনালির স্থায়ী ক্ষতিসাধন করে এটি শরীরের পুরো কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেমকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে। তবে আশার কথা হলো, মেটাবোলিক সিনড্রোম শনাক্ত করা অত্যন্ত সহজ। লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষা, ফাস্টিং ব্লাড সুগার, রক্তচাপ মাপা এবং কোমরের মাপ নেওয়ার মতো সাধারণ কিছু ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার মাধ্যমেই খুব সহজে এটি ধরা সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা বছরে অন্তত একবার রুটিন স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার ওপর জোর দিয়েছেন।
এই জটিল বিপাকজনিত সমস্যা থেকে সুরক্ষিত থাকতে হলে জীবনধারায় আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি। প্রতিদিন অন্তত ত্রিশ মিনিট দ্রুত গতিতে হাঁটার অভ্যাস, সপ্তাহে কয়েক দিন শরীরচর্চা বা শক্তি বর্ধক ব্যায়াম করা এবং খাদ্যতালিকায় অতিরিক্ত চিনি, ফাস্টফুড ও কোমল পানীয় বাদ দিয়ে শাকসবজি, ফলমূল ও পর্যাপ্ত প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখা অত্যন্ত কার্যকর। একই সঙ্গে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত ও সুষম ঘুম নিশ্চিত করা প্রয়োজন। চিকিৎসকদের মতে, সামান্য সচেতনতা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই পারে এই নীরব ঘাতক থেকে মানুষকে সুরক্ষিত রাখতে এবং একটি দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে।
রিপোর্টার নাম: 






















