জ্যামিতি কেবল খাতার পাতায় আঁকা কিছু শুকনো সমীকরণ কিংবা জটিল উপপাদ্যের রুটিন নয়; বরং সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারলে এটি হতে পারে বাস্তব জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর রহস্য উন্মোচনের অব্যর্থ হাতিয়ার। সাহিত্যের বিখ্যাত গোয়েন্দা শার্লক হোমস থেকে শুরু করে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের জনক আলবার্ট আইনস্টাইন—সবাই তাঁদের কর্মজীবনে জ্যামিতিক সূত্রের নান্দনিক ব্যবহার করেছেন। জ্যামিতির একটি অন্যতম শক্তিশালী ধারণা হলো ‘সদৃশ ত্রিভুজ’ বা সিমিলার ট্রায়াঙ্গেল, যা প্রাচীনকাল থেকে গণিতবিদ ও গবেষকদের মুগ্ধ করে আসছে। প্রাচীন গ্রিক গণিতবিদ থেলিস এই সদৃশ ত্রিভুজের ধারণার সাহায্যেই মিসরের সুবিশাল পিরামিডের উচ্চতা মেপে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন।
শার্লক হোমসের বিশ্ববিখ্যাত গল্প ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার অব দ্য মাসগ্রেভ রিচুয়াল’-এ এই জ্যামিতির জাদুকরী প্রয়োগ দেখা যায়। সেখানে বহু বছর আগে কেটে ফেলা একটি ওক গাছের ছায়ার দৈর্ঘ্য বের করতে হোমস আশ্রয় নেন জ্যামিতির। গাছটি বাস্তবে না থাকলেও, একটি নির্দিষ্ট সময়ে সূর্যের আলোর কোণ এবং ছিপের ছায়ার দৈর্ঘ্য মাপে ফেলে তিনি খুব সহজেই কেটে ফেলা গাছের নিখুঁত ছায়ার প্রান্তসীমা খুঁজে পান। তিনি লক্ষ্য করেন যে একটি নির্দিষ্ট সময়ে বস্তুর উচ্চতা এবং তার ছায়ার দৈর্ঘ্যের অনুপাত সবসময় সমান থাকে। এই সাধারণ গাণিতিক অনুপাত বা সদৃশ ত্রিভুজের তত্ত্ব ব্যবহার করেই তিনি অপরাধীর ফেলে যাওয়া গোপন চিহ্নের সন্ধান পান।
সদৃশ ত্রিভুজের কার্যকারিতা কেবল গোয়েন্দা গল্প বা প্রাচীন পিরামিড পরিমাপে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি গণিতের হাজার বছরের পুরনো জটিল ধাঁধারও সমাধান করতে সক্ষম। আজ থেকে প্রায় বারোশো বছর আগে, ৮৫০ খ্রিষ্টাব্দে বিখ্যাত ভারতীয় গণিতবিদ মহাবীর তাঁর গণিতগ্রন্থে একটি গলির দুই দেয়ালে আড়াআড়িভাবে রাখা দুটি মইয়ের ছেদবিন্দুর উচ্চতা সংক্রান্ত একটি চমৎকার ধাঁধার উল্লেখ করেছিলেন। জ্যামিতির নিয়ম অনুযায়ী, মই দুটির ছেদবিন্দুর উচ্চতা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে দেয়ালের স্পর্শবিন্দুর উচ্চতার ওপর, আর গলির চওড়া কতটুকু তার ওপর এর কোনো প্রভাবই পড়ে না। এই বিস্ময়কর সত্যটি প্রমাণিত হয় সদৃশ ত্রিভুজের বীজগণিতীয় অনুপাতের মাধ্যমে।
গণিতের ইতিহাসে পিথাগোরাসের উপপাদ্য প্রমাণের বহু পদ্ধতি রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে মার্জিত ও সহজ উপায়টি হলো সদৃশ ত্রিভুজের জাদুকরী প্রয়োগ। কিংবদন্তি বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন তাঁর শৈশবেই সদৃশ ত্রিভুজের নিখুঁত ধারণা ব্যবহার করে পিথাগোরাসের উপপাদ্যের একটি অনন্য প্রমাণ বের করেছিলেন বলে জানা যায়। একটি সমকোণী ত্রিভুজের সমকোণ থেকে অতিভুজের ওপর লম্ব টানলে যে ছোট ছোট ত্রিভুজ তৈরি হয়, তারা সবাই মূল ত্রিভুজের সাথে সদৃশ থাকে। এই গাণিতিক সত্যের ওপর ভিত্তি করে খুব সহজেই প্রমাণ করা যায় যে, লম্ব ও ভূমির ওপরের বর্গক্ষেত্রের ক্ষেত্রফলের সমষ্টি অতিভুজের বর্গক্ষেত্রের সমান। ফলে প্রমাণিত হয় যে, জ্যামিতি কেবল পরীক্ষাগার কিংবা পাঠ্যবইয়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়, বরং এটি আমাদের চারপাশের চারিত্রিক শৃঙ্খলা ও রোমাঞ্চকর জগৎ অনুধাবনের এক অনন্য চাবিকাঠি।
রিপোর্টার নাম: 





















