Hi

০৭:১১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে টানাপোড়েন: ফরাসি প্রতিনিধির বক্তব্য বয়কট করে বের হয়ে গেলেন মার্কিন কূটনীতিকেরা

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ইউক্রেন সংকট নিয়ে আয়োজিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রকাশ্য কূটনৈতিক সংঘাত সৃষ্টি হয়েছে। বৈঠকে ফরাসি প্রতিনিধি বক্তব্য দেওয়া শুরু করলে মার্কিন প্রতিনিধিদল ক্ষোভ প্রকাশ করে কক্ষ ত্যাগ করে। মূলত জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ফলকার টুর্কের মেয়াদ বৃদ্ধি সংক্রান্ত ভোটাভুটি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুদেশের চাটুকারিতা ও পাল্টাপাল্টি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের মিত্র রাষ্ট্র দুটির মধ্যে এ নজিরবিহীন উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।

ঘটনার সূত্রপাত জাতিসংঘের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভার্চুয়াল যুদ্ধ থেকে। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় নিযুক্ত ফরাসি জাতিসংঘ মিশন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে উল্লেখ করে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার বৈশ্বিক পরিচিতি এবং ‘মানবাধিকারের আলোকবর্তিকা’ হিসেবে অবস্থান হারিয়েছে। ফরাসি মিশন ওয়াশিংটনকে উত্তর কোরিয়া, নিকারাগুয়া, মালি ও রাশিয়ার মতো দেশের সারিতে খাড়া করে তীব্র সমালোচনা করে। এই কটাক্ষের জবাবে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিনিধি মাইক ওয়ালৎস জানান, ফ্রান্স এমন একজন মানবাধিকার প্রধানকে পুনর্নির্বাচিত করতে সমর্থন দিয়েছে যিনি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলের মতো স্বাধীন ও সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোকে নীতি শিক্ষা দেন, অথচ বিশ্বের নিকৃষ্টতম নিপীড়নকারীদের বিষয়ে নিরব ভূমিকা পালন করেন।

নিরাপত্তা পরিষদের নির্ধারিত বৈঠকে জেরোম বোনাফোঁ বক্তব্য দান শুরু করা মাত্রই মার্কিন প্রতিনিধিরা ক্ষুব্ধ হয়ে সভাকক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যান। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প প্রতিনিধি ড্যান নেগ্রিয়া প্রকাশ্যেই হুমকি দিয়ে জানান, ফ্রান্স তাদের এ ধরনের ‘অবজ্ঞাপূর্ণ ও অসম্মানজনক’ দৃষ্টিভঙ্গি ও মন্তব্য প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত মার্কিন প্রতিনিধিদল একইভাবে ফরাসি বক্তব্যের সময় সভা বয়কট করা জারি রাখবে। তবে সভা থেকে আমেরিকান প্রতিনিধিদের বের হয়ে যাওয়ার বিষয়ে ফরাসি রাষ্ট্রদূত বোনাফোঁ তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেননি। তিনি কেবল উল্লেখ করেন যে, বিশ্ব সংস্থার স্বকীয়তা, স্বাধীনতা এবং কার্যকরভাবে কাজ করার সক্ষমতা বজায় রাখতে ফ্রান্স কাজ করে যাচ্ছে।

মূলত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তা ফলকার টুর্কের মেয়াদ নবায়নকে কেন্দ্র করেই এই বৈরী সম্পর্কের সৃষ্টি হয়। ফিলিস্তিন ও ইরানে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে সোচ্চার সমালোচনা করায় টুর্ক শুরু থেকেই ওয়াশিংটনের তোপের মুখে পড়েন। মার্কিন বিরোধিতার মুখেও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ভোটাভুটিতে ১৪৪টি দেশের বিশাল সমর্থনে টুর্কের মেয়াদ বাড়ানো হয়। সেখানে ওয়াশিংটনের পক্ষে যোগ দিয়ে মাত্র ১০টি দেশ বিপক্ষে ভোট দেয় এবং ১৩টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে। এই পদক্ষেপের পর ট্রাম্প প্রশাসন জাতিসংঘের সঙ্গে মার্কিন সুসম্পর্ক ও আর্থিক সম্পৃক্ততা পুনর্মূল্যায়নের হুমকি দেয়।

উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন কর্তৃক জাতিসংঘ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর বাজেট ছাঁটাই করা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে নাম প্রত্যাহারের নীতি ইউরোপীয় মিত্রদের ক্ষুব্ধ করেছে। তাছাড়া ন্যাটোর প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধি, বাণিজ্যিক শুল্কনীতি এবং ডেনমার্কের অধীন গ্রিনল্যান্ড দখলের ব্যাপারে মার্কিন প্রেসিডেন্টের অনড় অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র-ফ্রান্স সম্পর্ককে তলানিতে নিয়ে ঠেকেছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েল ইস্যুতে মার্কিন সামরিক অভিযানে ফরাসি সরকার সরাসরি সমর্থন দিতে অস্বীকার করায় ওয়াশিংটনের ক্ষোভ আরও পুঞ্জীভূত হয়েছে, যার প্রতিফলন এবার দেখা গেল জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে।

জনপ্রিয়

মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অধ্যায়: যেভাবে এসেছিল হজরত নুহ (আ.)-এর আমলের মহাপ্লাবন

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে টানাপোড়েন: ফরাসি প্রতিনিধির বক্তব্য বয়কট করে বের হয়ে গেলেন মার্কিন কূটনীতিকেরা

আপডেট : ০৩:২৩:০২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ইউক্রেন সংকট নিয়ে আয়োজিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রকাশ্য কূটনৈতিক সংঘাত সৃষ্টি হয়েছে। বৈঠকে ফরাসি প্রতিনিধি বক্তব্য দেওয়া শুরু করলে মার্কিন প্রতিনিধিদল ক্ষোভ প্রকাশ করে কক্ষ ত্যাগ করে। মূলত জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ফলকার টুর্কের মেয়াদ বৃদ্ধি সংক্রান্ত ভোটাভুটি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুদেশের চাটুকারিতা ও পাল্টাপাল্টি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের মিত্র রাষ্ট্র দুটির মধ্যে এ নজিরবিহীন উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।

ঘটনার সূত্রপাত জাতিসংঘের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভার্চুয়াল যুদ্ধ থেকে। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় নিযুক্ত ফরাসি জাতিসংঘ মিশন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে উল্লেখ করে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার বৈশ্বিক পরিচিতি এবং ‘মানবাধিকারের আলোকবর্তিকা’ হিসেবে অবস্থান হারিয়েছে। ফরাসি মিশন ওয়াশিংটনকে উত্তর কোরিয়া, নিকারাগুয়া, মালি ও রাশিয়ার মতো দেশের সারিতে খাড়া করে তীব্র সমালোচনা করে। এই কটাক্ষের জবাবে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিনিধি মাইক ওয়ালৎস জানান, ফ্রান্স এমন একজন মানবাধিকার প্রধানকে পুনর্নির্বাচিত করতে সমর্থন দিয়েছে যিনি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলের মতো স্বাধীন ও সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোকে নীতি শিক্ষা দেন, অথচ বিশ্বের নিকৃষ্টতম নিপীড়নকারীদের বিষয়ে নিরব ভূমিকা পালন করেন।

নিরাপত্তা পরিষদের নির্ধারিত বৈঠকে জেরোম বোনাফোঁ বক্তব্য দান শুরু করা মাত্রই মার্কিন প্রতিনিধিরা ক্ষুব্ধ হয়ে সভাকক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যান। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প প্রতিনিধি ড্যান নেগ্রিয়া প্রকাশ্যেই হুমকি দিয়ে জানান, ফ্রান্স তাদের এ ধরনের ‘অবজ্ঞাপূর্ণ ও অসম্মানজনক’ দৃষ্টিভঙ্গি ও মন্তব্য প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত মার্কিন প্রতিনিধিদল একইভাবে ফরাসি বক্তব্যের সময় সভা বয়কট করা জারি রাখবে। তবে সভা থেকে আমেরিকান প্রতিনিধিদের বের হয়ে যাওয়ার বিষয়ে ফরাসি রাষ্ট্রদূত বোনাফোঁ তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেননি। তিনি কেবল উল্লেখ করেন যে, বিশ্ব সংস্থার স্বকীয়তা, স্বাধীনতা এবং কার্যকরভাবে কাজ করার সক্ষমতা বজায় রাখতে ফ্রান্স কাজ করে যাচ্ছে।

মূলত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তা ফলকার টুর্কের মেয়াদ নবায়নকে কেন্দ্র করেই এই বৈরী সম্পর্কের সৃষ্টি হয়। ফিলিস্তিন ও ইরানে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে সোচ্চার সমালোচনা করায় টুর্ক শুরু থেকেই ওয়াশিংটনের তোপের মুখে পড়েন। মার্কিন বিরোধিতার মুখেও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ভোটাভুটিতে ১৪৪টি দেশের বিশাল সমর্থনে টুর্কের মেয়াদ বাড়ানো হয়। সেখানে ওয়াশিংটনের পক্ষে যোগ দিয়ে মাত্র ১০টি দেশ বিপক্ষে ভোট দেয় এবং ১৩টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে। এই পদক্ষেপের পর ট্রাম্প প্রশাসন জাতিসংঘের সঙ্গে মার্কিন সুসম্পর্ক ও আর্থিক সম্পৃক্ততা পুনর্মূল্যায়নের হুমকি দেয়।

উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন কর্তৃক জাতিসংঘ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর বাজেট ছাঁটাই করা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে নাম প্রত্যাহারের নীতি ইউরোপীয় মিত্রদের ক্ষুব্ধ করেছে। তাছাড়া ন্যাটোর প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধি, বাণিজ্যিক শুল্কনীতি এবং ডেনমার্কের অধীন গ্রিনল্যান্ড দখলের ব্যাপারে মার্কিন প্রেসিডেন্টের অনড় অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র-ফ্রান্স সম্পর্ককে তলানিতে নিয়ে ঠেকেছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েল ইস্যুতে মার্কিন সামরিক অভিযানে ফরাসি সরকার সরাসরি সমর্থন দিতে অস্বীকার করায় ওয়াশিংটনের ক্ষোভ আরও পুঞ্জীভূত হয়েছে, যার প্রতিফলন এবার দেখা গেল জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে।