Hi

০৬:৪৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিপীড়নের প্রতিবাদে ষষ্ঠ দিনেও শিক্ষার্থীদের ক্লাস বর্জন, মশাল মিছিল ও গণসংগীত

যৌন হয়রানি, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং সব ধরনের নিপীড়নের বিরুদ্ধে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে (খুবি) চলমান ছাত্র আন্দোলনের আজ ষষ্ঠ দিন। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা আজও ক্লাস এবং পরীক্ষা বর্জন করে তাদের প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিতকরণ, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতার দাবিতে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সৃজনশীল ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছেন। এর অংশ হিসেবে সোমবার রাত সাড়ে আটটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অদম্য বাংলা’ ভাস্কর্য চত্বরে শত শত শিক্ষার্থী জড়ো হয়ে মশাল প্রজ্বলন করেন এবং প্রতিবাদী গণসংগীত পরিবেশন করেন।

রাত প্রায় দশটা পর্যন্ত চলা এই কর্মসূচিতে বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। এ সময় তাঁরা ক্যাম্পাসের প্রতিটি কোণায় নিপীড়ক ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদের বার্তা ছড়িয়ে দেন। সাম্প্রতিক সময়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া কয়েকটি গুরুতর অপরাধমূলক ঘটনার জেরে এই তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ক্যাম্পাসের বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক রুবেল আনছার এবং অ্যাগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠে। এছাড়া বিজয় ’২৪ হলের একটি ক্যানটিনের কর্মী ইমাম হাসানের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের গোপনে ভিডিও ধারণ করার মতো ন্যক্কারজনক অভিযোগ পাওয়া যায়। এসব ঘটনার সুষ্ঠু বিচার এবং স্থায়ী সমাধানের দাবিতে শিক্ষার্থীরা অনির্দিষ্টকালের জন্য সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বর্জনের ঘোষণা দেন।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট তিন দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। প্রথমত, বিজয় ’২৪ হলের ছাত্রীদের গোপন ভিডিও ধারণের অভিযোগে অভিযুক্ত ক্যানটিন কর্মী ইমাম হাসানের দৃষ্টান্তমূলক ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং এই ঘটনায় দায়িত্বে চরম অবহেলার পরিচয় দেওয়ায় সংশ্লিষ্ট হলের প্রভোস্ট বডিকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত দুই অধ্যাপককে অবিলম্বে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করতে হবে এবং সম্প্রতি বিতর্কিত প্রক্রিয়ায় গঠিত ‘স্পন্দন-২৪’ ক্লাবের নিবন্ধন বাতিল করতে হবে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এই ক্লাবটি গঠনের পেছনের উদ্দেশ্য এবং প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অস্বচ্ছ।

এদিকে আন্দোলনের তীব্রতার মুখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে। শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি লিখিত বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক পরিচালক অধ্যাপক মো. সালাউদ্দীন গণমাধ্যমকে জানান, ঘটনার তদন্তের জন্য প্রশাসন সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্তপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার মধ্যে সোমবার পর্যন্ত দুই কর্মদিবস অতিবাহিত হয়েছে। তদন্তের বর্তমান অগ্রগতি বেশ সন্তোষজনক উল্লেখ করে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়া যাবে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে সিন্ডিকেট সভা ডেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তবে প্রশাসন আশ্বস্ত করলেও শিক্ষার্থীরা মাঠ ছাড়তে নারাজ। মশাল প্রজ্বলন কর্মসূচি শেষে চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী হাবিবুল্লাহ খান স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে তাঁদের এই কণ্ঠস্বর কোনো অবস্থাতেই থামবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা ন্যায়বিচার না পান এবং তাঁদের যৌক্তিক দাবিগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। প্রয়োজনে আগামী দিনগুলোতে আরও কঠোর ও ধারাবাহিক কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

অন্যদিকে, টানা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ফলে ক্যাম্পাসে এক ধরণের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, যা নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরাও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ইতিহাস ও সভ্যতা ডিসিপ্লিনের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী রানা মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, সেশনজটমুক্ত ক্যাম্পাস হিসেবে পরিচিত খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও বর্তমান সংকটের কারণে পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং তাঁরা বড় ধরনের ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। তবে তিনি এও স্পষ্ট করেন যে, একটি নিরাপদ ও সুষ্ঠু পরিবেশের স্বার্থেই এই সংকটের স্থায়ী সমাধান অত্যন্ত জরুরি। এই অবস্থায় শিক্ষক ও প্রশাসনের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণই পারে ক্যাম্পাসে শান্তি ও স্বাভাবিক শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে।

জনপ্রিয়

বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুললেন প্রেসিডেন্ট মিলেই

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিপীড়নের প্রতিবাদে ষষ্ঠ দিনেও শিক্ষার্থীদের ক্লাস বর্জন, মশাল মিছিল ও গণসংগীত

আপডেট : ১২:২৩:৩৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬

যৌন হয়রানি, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং সব ধরনের নিপীড়নের বিরুদ্ধে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে (খুবি) চলমান ছাত্র আন্দোলনের আজ ষষ্ঠ দিন। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা আজও ক্লাস এবং পরীক্ষা বর্জন করে তাদের প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিতকরণ, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতার দাবিতে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সৃজনশীল ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছেন। এর অংশ হিসেবে সোমবার রাত সাড়ে আটটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অদম্য বাংলা’ ভাস্কর্য চত্বরে শত শত শিক্ষার্থী জড়ো হয়ে মশাল প্রজ্বলন করেন এবং প্রতিবাদী গণসংগীত পরিবেশন করেন।

রাত প্রায় দশটা পর্যন্ত চলা এই কর্মসূচিতে বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। এ সময় তাঁরা ক্যাম্পাসের প্রতিটি কোণায় নিপীড়ক ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদের বার্তা ছড়িয়ে দেন। সাম্প্রতিক সময়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া কয়েকটি গুরুতর অপরাধমূলক ঘটনার জেরে এই তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ক্যাম্পাসের বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক রুবেল আনছার এবং অ্যাগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠে। এছাড়া বিজয় ’২৪ হলের একটি ক্যানটিনের কর্মী ইমাম হাসানের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের গোপনে ভিডিও ধারণ করার মতো ন্যক্কারজনক অভিযোগ পাওয়া যায়। এসব ঘটনার সুষ্ঠু বিচার এবং স্থায়ী সমাধানের দাবিতে শিক্ষার্থীরা অনির্দিষ্টকালের জন্য সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বর্জনের ঘোষণা দেন।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট তিন দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। প্রথমত, বিজয় ’২৪ হলের ছাত্রীদের গোপন ভিডিও ধারণের অভিযোগে অভিযুক্ত ক্যানটিন কর্মী ইমাম হাসানের দৃষ্টান্তমূলক ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং এই ঘটনায় দায়িত্বে চরম অবহেলার পরিচয় দেওয়ায় সংশ্লিষ্ট হলের প্রভোস্ট বডিকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত দুই অধ্যাপককে অবিলম্বে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করতে হবে এবং সম্প্রতি বিতর্কিত প্রক্রিয়ায় গঠিত ‘স্পন্দন-২৪’ ক্লাবের নিবন্ধন বাতিল করতে হবে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এই ক্লাবটি গঠনের পেছনের উদ্দেশ্য এবং প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অস্বচ্ছ।

এদিকে আন্দোলনের তীব্রতার মুখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে। শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি লিখিত বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক পরিচালক অধ্যাপক মো. সালাউদ্দীন গণমাধ্যমকে জানান, ঘটনার তদন্তের জন্য প্রশাসন সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্তপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার মধ্যে সোমবার পর্যন্ত দুই কর্মদিবস অতিবাহিত হয়েছে। তদন্তের বর্তমান অগ্রগতি বেশ সন্তোষজনক উল্লেখ করে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়া যাবে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে সিন্ডিকেট সভা ডেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তবে প্রশাসন আশ্বস্ত করলেও শিক্ষার্থীরা মাঠ ছাড়তে নারাজ। মশাল প্রজ্বলন কর্মসূচি শেষে চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী হাবিবুল্লাহ খান স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে তাঁদের এই কণ্ঠস্বর কোনো অবস্থাতেই থামবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা ন্যায়বিচার না পান এবং তাঁদের যৌক্তিক দাবিগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। প্রয়োজনে আগামী দিনগুলোতে আরও কঠোর ও ধারাবাহিক কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

অন্যদিকে, টানা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ফলে ক্যাম্পাসে এক ধরণের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, যা নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরাও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ইতিহাস ও সভ্যতা ডিসিপ্লিনের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী রানা মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, সেশনজটমুক্ত ক্যাম্পাস হিসেবে পরিচিত খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও বর্তমান সংকটের কারণে পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং তাঁরা বড় ধরনের ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। তবে তিনি এও স্পষ্ট করেন যে, একটি নিরাপদ ও সুষ্ঠু পরিবেশের স্বার্থেই এই সংকটের স্থায়ী সমাধান অত্যন্ত জরুরি। এই অবস্থায় শিক্ষক ও প্রশাসনের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণই পারে ক্যাম্পাসে শান্তি ও স্বাভাবিক শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে।