বাংলাদেশে গুমের অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে নতুন একটি আইনের খসড়া প্রকাশ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভের পর বর্তমান বিএনপি সরকার এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে জারীকৃত অধ্যাদেশ পর্যালোচনার অংশ হিসেবে এই নতুন আইন প্রণয়নের কাজ চলছে। প্রস্তাবিত খসড়া অনুযায়ী, গুমের ঘটনার তদন্তের প্রাথমিক দায়িত্ব পুলিশের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর ছিল। তবে পুলিশের হাতে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) মনে করে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিয়ে এই ধরনের সংবেদনশীল অপরাধের তদন্ত করা হলে প্রকৃত জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ফৌজদারি কার্যবিধি (সিআরপিসি) অনুযায়ী অপরাধের তদন্তের এখতিয়ার পুলিশের থাকায় মানবাধিকার কমিশনকে এই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। খসড়া আইনে বলা হয়েছে, কোনো কারণে থানা অভিযোগ গ্রহণে অপারগ হলে ভুক্তভোগী পক্ষ সরাসরি এখতিয়ারসম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নালিশি মামলা দায়ের করার সুযোগ পাবেন। এছাড়া তদন্তের ক্ষেত্রে কঠোর সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, যেখানে তদন্ত কর্মকর্তাকে ৯০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে আদালত আরও সর্বোচ্চ ৩০ দিন সময় বৃদ্ধি করতে পারবেন। নির্ধারিত সময়ে তদন্ত শেষ করতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিধান রাখা হয়েছে।
প্রস্তাবিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন’ অনুযায়ী গুমের সংজ্ঞায় সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সরকারি কোনো সংস্থা কর্তৃক কোনো ব্যক্তিকে আটক বা অপহরণের পর তার অবস্থান গোপন রাখা বা অস্বীকার করাই গুম হিসেবে গণ্য হবে। ভুক্তভোগীর মৃত্যু ঘটলে, মৃতদেহ উদ্ধার হলে কিংবা ঘটনার পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও কোনো সন্ধান না মিললে অপরাধীর জন্য মৃত্যুদণ্ড বা যাবজীবন কারাদণ্ডের কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে অপরাধের সঙ্গে জড়িত অধস্তনদের পাশাপাশি তাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা নির্দেশদাতারাও একই মাত্রার শাস্তির মুখোমুখি হবেন, যদি তারা অপরাধ রোধে ব্যর্থ হন বা প্রশ্রয় দেন।
আইনটিতে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের আইনি ও অর্থনৈতিক ভোগান্তি লাঘবের জন্যও বিশেষ বিধান যুক্ত করা হয়েছে। নিখোঁজ ব্যক্তির স্বজনদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত ‘গুম সনদ’ বা প্রত্যয়নপত্র ইস্যু করবেন, যার মাধ্যমে পরিবারগুলো স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি পরিচালনা এবং ব্যবহার করতে পারবে। পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও সন্ধান না মিললে বৈধ উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের পথ উন্মুক্ত হবে। পাশাপাশি, ভুক্তভোগীদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও আইনি সহায়তার জন্য একটি বিশেষ সরকারি তহবিল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা অপরাধীদের কাছ থেকে আদায়কৃত জরিমানা দিয়ে পরিচালিত হবে। তবে মিথ্যা বা হয়রানিমূলক মামলা রোধে কঠোর শাস্তির বিধানও রাখা হয়েছে, যাতে কেউ এই আইনের অপব্যবহার করতে না পারে। অংশীজনদের মতামতের জন্য খসড়াটি বর্তমানে ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত রয়েছে এবং খুব দ্রুত তা মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য তোলা হবে।
রিপোর্টার নাম: 




















