Hi

০১:৩৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬, ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কুড়িগ্রামে বন্যার পানিতে ডুবল বাদামখেত, কৃষি বিভাগের কার্যক্রমে ক্ষোভ

টানা বর্ষণ এবং উজানের ঢলের প্রভাবে তিস্তা নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের বাদাম ও সবজিখেত পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে কৃষি বিভাগের সবজিবীজ বিতরণ কর্মসূচি নিয়ে কৃষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাঁদের দাবি, এই মুহূর্তে বীজ নয়, বরং বন্যা পূর্বাভাস, আশ্রয় এবং ত্রাণ সহায়তা জরুরি।

রাজারহাটের চর খিতাবখাঁ গ্রামের ৬০ বছর বয়সী কৃষক এরশাদুল হক জানান, তিস্তার ভাঙনে নিজের পৈতৃক জমি হারানোর পর তিনি অন্যের এক একর জমি ইজারা নিয়ে বাদাম চাষ করেছিলেন। কিন্তু আকস্মিক বন্যায় তাঁর পুরো খেত পানিতে ডুবে গেছে। বাধ্য হয়ে তিনি পানির নিচ থেকে আধা পাকা বাদাম তুলে এনে সড়কের ওপর শুকাতে বাধ্য হচ্ছেন। এরশাদুল হক হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, “আল্লাহ দিলে ফসল খারাপ হয়নি, কিন্তু বন্যায় সইল না। কাঁচা বাদাম তুলে আনতে হলো। অর্ধেক পাকা, অর্ধেক কাঁচা অবস্থায় পানির নিচ থেকে তুলছি। রোদ ভালো না হলে শুকাবে না, বেশির ভাগই নষ্ট হবে।” তাঁর এই কথায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষকদের অসহায়ত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, পানি বাড়ার পর উপজেলা প্রশাসন বা কৃষি বিভাগের কোনো কর্মকর্তা তাঁদের খোঁজখবর নেননি। এমন পরিস্থিতিতে গত সোমবার বিকেলে কৃষি বিভাগের উদ্যোগে তিস্তাপাড়ে সবজিবীজ বিতরণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এই কর্মসূচিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানজিলা তাসনিম এবং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছা. সাইফুন্নাহার সাথী উপস্থিত ছিলেন। কৃষকেরা মনে করছেন, বন্যার ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে কৃষি বিভাগের এই কার্যক্রম মোটেও সময়োপযোগী নয়।

খিতাবখাঁ-বুড়িরহাট এলাকার ৫৫ বছর বয়সী বাসিন্দা আবদুর রশীদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “তিস্তার পানি হু হু করে বাড়ছে। চিন্তায় আমরা ঘুমাতে পারি না। আর ইউএনও সবজির বীজ নিয়ে আসছেন। এই সময় আমাদের দরকার বন্যার পানি কত বাড়বে, আশ্রয় কোথায় পাব, ত্রাণ কবে আসবে, এসব খবর।” তাঁর এই বক্তব্য কৃষকদের বর্তমান চাহিদার সঙ্গে প্রশাসনিক কার্যক্রমের অসামঞ্জস্য তুলে ধরে।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিলা তাসনিম বলেন, “বন্যায় পানিবন্দী মানুষের জন্য আমি কী পরামর্শ দেব?” তিনি আরও জানান যে সবজির বীজ বিতরণ কৃষি বিভাগের একটি নিয়মিত কার্যক্রম, তিনি কেবল এর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছা. সাইফুন্নাহার সাথী ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের খোঁজখবর না নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও ফসলের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তিনি কৃষকদের উদ্দেশে পরামর্শ দিয়ে বলেন, বন্যায় তলিয়ে যাওয়া বাদাম বেশিক্ষণ পানির নিচে রাখা যাবে না। পানি পুরোপুরি নামার অপেক্ষা না করে দ্রুত তুলে ফেলতে হবে। এতে পচন ও অঙ্কুরোদ্‌গমের ঝুঁকি কমবে। ভেজা বাদাম কোনোভাবেই স্তূপ করে রাখা যাবে না। ডাল থেকে আলাদা করে পাতলা করে রোদে শুকাতে হবে। রোদ না থাকলে বাতাস চলাচল করে এমন উঁচু ও শুকনা স্থানে ছড়িয়ে রাখতে হবে।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত উজানের ঢল কিছুটা কমায় জেলার বেশিরভাগ নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। ধরলা নদীর পানি কুড়িগ্রাম পয়েন্টে বিপৎসীমার ৪৪ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে, ব্রহ্মপুত্র নদের পানি নুনখাওয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ৬৭ সেন্টিমিটার এবং চিলমারী পয়েন্টে ৫৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তা নদীর পানি কাউনিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ৩৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও, দুধকুমার নদের পানি পাটেশ্বরী পয়েন্টে বিপৎসীমার ২১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। ইতোমধ্যে দুধকুমার নদের বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে, যা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এই পরিস্থিতি কুড়িগ্রামের বন্যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে, যেখানে একদিকে কিছু নদীর পানি কমছে, অন্যদিকে নতুন করে ভাঙন ও জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে। কৃষকদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

বড়ছড়ায় ব্যবসায়ীদের হয়রানি ও অপপ্রচারের প্রতিবাদে মানববন্ধন

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

কুড়িগ্রামে বন্যার পানিতে ডুবল বাদামখেত, কৃষি বিভাগের কার্যক্রমে ক্ষোভ

আপডেট : ০২:৩৮:২৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

টানা বর্ষণ এবং উজানের ঢলের প্রভাবে তিস্তা নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের বাদাম ও সবজিখেত পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে কৃষি বিভাগের সবজিবীজ বিতরণ কর্মসূচি নিয়ে কৃষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাঁদের দাবি, এই মুহূর্তে বীজ নয়, বরং বন্যা পূর্বাভাস, আশ্রয় এবং ত্রাণ সহায়তা জরুরি।

রাজারহাটের চর খিতাবখাঁ গ্রামের ৬০ বছর বয়সী কৃষক এরশাদুল হক জানান, তিস্তার ভাঙনে নিজের পৈতৃক জমি হারানোর পর তিনি অন্যের এক একর জমি ইজারা নিয়ে বাদাম চাষ করেছিলেন। কিন্তু আকস্মিক বন্যায় তাঁর পুরো খেত পানিতে ডুবে গেছে। বাধ্য হয়ে তিনি পানির নিচ থেকে আধা পাকা বাদাম তুলে এনে সড়কের ওপর শুকাতে বাধ্য হচ্ছেন। এরশাদুল হক হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, “আল্লাহ দিলে ফসল খারাপ হয়নি, কিন্তু বন্যায় সইল না। কাঁচা বাদাম তুলে আনতে হলো। অর্ধেক পাকা, অর্ধেক কাঁচা অবস্থায় পানির নিচ থেকে তুলছি। রোদ ভালো না হলে শুকাবে না, বেশির ভাগই নষ্ট হবে।” তাঁর এই কথায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষকদের অসহায়ত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, পানি বাড়ার পর উপজেলা প্রশাসন বা কৃষি বিভাগের কোনো কর্মকর্তা তাঁদের খোঁজখবর নেননি। এমন পরিস্থিতিতে গত সোমবার বিকেলে কৃষি বিভাগের উদ্যোগে তিস্তাপাড়ে সবজিবীজ বিতরণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এই কর্মসূচিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানজিলা তাসনিম এবং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছা. সাইফুন্নাহার সাথী উপস্থিত ছিলেন। কৃষকেরা মনে করছেন, বন্যার ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে কৃষি বিভাগের এই কার্যক্রম মোটেও সময়োপযোগী নয়।

খিতাবখাঁ-বুড়িরহাট এলাকার ৫৫ বছর বয়সী বাসিন্দা আবদুর রশীদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “তিস্তার পানি হু হু করে বাড়ছে। চিন্তায় আমরা ঘুমাতে পারি না। আর ইউএনও সবজির বীজ নিয়ে আসছেন। এই সময় আমাদের দরকার বন্যার পানি কত বাড়বে, আশ্রয় কোথায় পাব, ত্রাণ কবে আসবে, এসব খবর।” তাঁর এই বক্তব্য কৃষকদের বর্তমান চাহিদার সঙ্গে প্রশাসনিক কার্যক্রমের অসামঞ্জস্য তুলে ধরে।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিলা তাসনিম বলেন, “বন্যায় পানিবন্দী মানুষের জন্য আমি কী পরামর্শ দেব?” তিনি আরও জানান যে সবজির বীজ বিতরণ কৃষি বিভাগের একটি নিয়মিত কার্যক্রম, তিনি কেবল এর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছা. সাইফুন্নাহার সাথী ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের খোঁজখবর না নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও ফসলের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তিনি কৃষকদের উদ্দেশে পরামর্শ দিয়ে বলেন, বন্যায় তলিয়ে যাওয়া বাদাম বেশিক্ষণ পানির নিচে রাখা যাবে না। পানি পুরোপুরি নামার অপেক্ষা না করে দ্রুত তুলে ফেলতে হবে। এতে পচন ও অঙ্কুরোদ্‌গমের ঝুঁকি কমবে। ভেজা বাদাম কোনোভাবেই স্তূপ করে রাখা যাবে না। ডাল থেকে আলাদা করে পাতলা করে রোদে শুকাতে হবে। রোদ না থাকলে বাতাস চলাচল করে এমন উঁচু ও শুকনা স্থানে ছড়িয়ে রাখতে হবে।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত উজানের ঢল কিছুটা কমায় জেলার বেশিরভাগ নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। ধরলা নদীর পানি কুড়িগ্রাম পয়েন্টে বিপৎসীমার ৪৪ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে, ব্রহ্মপুত্র নদের পানি নুনখাওয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ৬৭ সেন্টিমিটার এবং চিলমারী পয়েন্টে ৫৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তা নদীর পানি কাউনিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ৩৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও, দুধকুমার নদের পানি পাটেশ্বরী পয়েন্টে বিপৎসীমার ২১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। ইতোমধ্যে দুধকুমার নদের বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে, যা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এই পরিস্থিতি কুড়িগ্রামের বন্যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে, যেখানে একদিকে কিছু নদীর পানি কমছে, অন্যদিকে নতুন করে ভাঙন ও জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে। কৃষকদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।