Hi

০৪:৫১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিস্মৃত বাংলার বিজ্ঞাপন শিল্প: হারিয়ে যাওয়া শিল্পীদের অন্বেষণ

বাংলা সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়েও বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছে প্রারম্ভিক বাংলার বিজ্ঞাপন শিল্প এবং এর নেপথ্যের গুণী শিল্পীরা। যে বিজ্ঞাপনগুলো একসময় গ্রামীণ হাটে খোল কোম্পানির দাদের মলমের স্লোগান নিয়ে ধ্বনিত হতো, অথবা গওহর জানের সিগারেট হাতে রঙিন চিত্র শোভা পেতো, আজকের প্রজন্ম তার খুব কমই প্রত্যক্ষ করেছে। পুরাতন সংবাদপত্র আর ডিজিটাল আর্কাইভের দৌলতে এই হারিয়ে যাওয়া শিল্পকলাকে পুনরায় আবিষ্কারের এক চলমান প্রচেষ্টা যেন আলীবাবার গুহার গুপ্তধনের মতো আমাদের সামনে উন্মোচন করছে এক লুপ্তপ্রায় জগতের ঝলক।

বিশ শতকের শুরুর দিকের বাংলার জনজীবন, বিশ্বাস ও জনপ্রিয় সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি ছিল এই বিজ্ঞাপনগুলো। অশক্তাবক্র টুথপাউডার, খাদি প্রতিষ্ঠানের গো-রক্ষার অঙ্গীকার, চৈতন্য-লীলার লোকনৃত্য শুরুর ঘোষণা, হিমকল্যাণ কেশতৈল বা গোপাল ভাঁড়ের রহস্যের ছোট পুস্তিকা – প্রতিটি বিজ্ঞাপনই ছিল তৎকালীন সমাজের দর্পণ। এগুলি কেবল পণ্য প্রচারের মাধ্যম ছিল না, বরং বাঙালির দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল। এই ধরনের বিজ্ঞাপনগুলি এক নীরব সাক্ষী হিসেবে কাজ করেছে, যা সময়ের সাথে সাথে হারিয়ে গেছে এবং এর নির্মাতারাও রয়ে গেছেন প্রায় অজ্ঞাত।

এই হারিয়ে যাওয়া শিল্প ও শিল্পীদের অন্বেষণ অনেকটা টিউডর পারফিটের ‘দ্য লস্ট ট্রাইবস অব ইসরায়েল’ বইয়ের কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে ইসরায়েলের হারানো উপজাতিদের খোঁজে অভিযান চালানো হয়েছিল। একইভাবে, প্রেমেন্দ্র মিত্রের কালীঘাটের পটুয়াদের হারিয়ে যাওয়ার গল্পও প্রাসঙ্গিক। এসব বিজ্ঞাপনের পেছনের অসংখ্য শিল্পী, যাদের নাম বা পরিচয় আজ প্রায় অজানা, তারা যেন এই হারিয়ে যাওয়া উপজাতি বা পটুয়াদেরই উত্তরসূরি। তাদের বেশিরভাগই কখনো নিজেদের স্বাক্ষর রাখার সুযোগ পাননি, আর যারা রেখেছিলেন, তাদের নামও অনেক সময় এজেন্সি কর্তৃক মুছে ফেলা হতো।

শিল্প সমালোচকদের একাংশ, যেমন শিল্পী রঘুনাথ গোস্বামী, এই ধরনের বিজ্ঞাপন চিত্রকে ‘শিল্প বস্তুর নির্বোধ এবং নির্বিচার সরলীকরণ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাদের মতে, এগুলিতে শিল্পমূল্য বা নান্দনিকতা নেই। তবে, গভীর দৃষ্টিতে দেখলে এই আপাত ‘কদর্য’ বিজ্ঞাপনচিত্রগুলিতেও প্রচুর হাস্যরস, বেদনা এবং তৎকালীন সমাজের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাওয়া যায়। দাদের মলম বা চুল গজানোর টনিকের বিজ্ঞাপনগুলিও সেই সময়ের মানুষের চাহিদা, বিশ্বাস এবং জীবনযাপনের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এগুলি উচ্চাঙ্গের শিল্প না হলেও, বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের মূল্যবান উপাদান।

মানসিক রোগের চিকিৎসার বিজ্ঞাপনগুলি এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৫২ সালের একটি বিজ্ঞাপনে ‘এবিডি পিলস’ এবং ‘দত্ত অয়েল’ দিয়ে মানসিক অসুস্থতা সারানোর দাবি করা হয়েছিল, যার প্রধান কার্যালয় ছিল ২৯-এ বিবেকানন্দ রোড, জোড়াসাঁকোতে। জোড়াসাঁকোর নাম আসতেই মনে পড়ে ঠাকুর পরিবারের কথা, যেখানে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের চতুর্থ পুত্র বীরেন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্রনাথের ভাই সোমেন্দ্রনাথ মানসিক অস্থিরতায় ভুগেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই নাকি ‘এস. সি. রায় অ্যান্ড কোং’-এর ‘পাগল সারানোর মহৌষধ’-এর কার্যকারিতা সম্পর্কে অবগত ছিলেন বলে বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছিল। এই বিজ্ঞাপনগুলি কেবল বাণিজ্যিক প্রচার ছিল না, বরং তৎকালীন চিকিৎসাব্যবস্থা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপরও আলোকপাত করে।

কলকাতায় বিজ্ঞাপন শিল্পের গোড়াপত্তন ঘটে ১৯২০-এর দশকে, যেখানে ১৯২৮ সালে ‘প্যারাডাইস অ্যাডভার্টাইজিং’ এবং ১৯৩৭ সালে ‘স্ট্রোনাচ অ্যাডভার্টাইজিং’-এর মতো সংস্থাগুলি গড়ে ওঠে। ও.সি. গাঙ্গুলীর মতো কিংবদন্তি শিল্পীরা সে সময় মাসিক চল্লিশ টাকা বেতনে কাজ করতেন। তবে, দেশভাগের আগে পূর্ব বাংলায় (বর্তমান বাংলাদেশ) তেমন কোনো আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞাপন সংস্থার অস্তিত্ব ছিল না। স্থানীয় ছোট ব্যবসায়ীরা প্রায়শই এজেন্সিগুলোতে না গিয়ে স্থানীয় শিল্পীদের দিয়ে ‘কদর্য’ (আধুনিক মানদণ্ডে) চিত্র তৈরি করিয়ে সংবাদপত্রে ছাপাতেন। এসব বিজ্ঞাপনের হস্তলিপি প্রায়শই অপেশাদারী ছিল, যা পেশাদার সংস্থার মানদণ্ড পূরণ করতো না।

বাংলার এই বিস্মৃত বিজ্ঞাপন শিল্পকে পুনরায় আবিষ্কার করা কেবল ইতিহাসের পাতা উল্টানো নয়, বরং এক হারানো সাংস্কৃতিক অধ্যায়কে পুনরুদ্ধার করা। এই চিত্রগুলি কেবল পণ্য বিক্রির জন্য তৈরি হয়নি, বরং এগুলি বাংলার সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক বিবর্তনের অমূল্য সাক্ষী। এই শিল্পকর্মগুলিকে যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান এবং সংরক্ষণ করা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অপরিহার্য, যাতে তারা তাদের পূর্বপুরুষদের জীবনযাত্রা এবং শিল্পচেতনা সম্পর্কে অবগত হতে পারে।

নাটকীয় জয়: ৯৬ মিনিটের গোলে শেষ ষোলোতে ব্রাজিল, জাপানের স্বপ্নভঙ্গ

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ খন্দকার আইটি

বিস্মৃত বাংলার বিজ্ঞাপন শিল্প: হারিয়ে যাওয়া শিল্পীদের অন্বেষণ

আপডেট : ০২:২৩:৩৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

বাংলা সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়েও বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছে প্রারম্ভিক বাংলার বিজ্ঞাপন শিল্প এবং এর নেপথ্যের গুণী শিল্পীরা। যে বিজ্ঞাপনগুলো একসময় গ্রামীণ হাটে খোল কোম্পানির দাদের মলমের স্লোগান নিয়ে ধ্বনিত হতো, অথবা গওহর জানের সিগারেট হাতে রঙিন চিত্র শোভা পেতো, আজকের প্রজন্ম তার খুব কমই প্রত্যক্ষ করেছে। পুরাতন সংবাদপত্র আর ডিজিটাল আর্কাইভের দৌলতে এই হারিয়ে যাওয়া শিল্পকলাকে পুনরায় আবিষ্কারের এক চলমান প্রচেষ্টা যেন আলীবাবার গুহার গুপ্তধনের মতো আমাদের সামনে উন্মোচন করছে এক লুপ্তপ্রায় জগতের ঝলক।

বিশ শতকের শুরুর দিকের বাংলার জনজীবন, বিশ্বাস ও জনপ্রিয় সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি ছিল এই বিজ্ঞাপনগুলো। অশক্তাবক্র টুথপাউডার, খাদি প্রতিষ্ঠানের গো-রক্ষার অঙ্গীকার, চৈতন্য-লীলার লোকনৃত্য শুরুর ঘোষণা, হিমকল্যাণ কেশতৈল বা গোপাল ভাঁড়ের রহস্যের ছোট পুস্তিকা – প্রতিটি বিজ্ঞাপনই ছিল তৎকালীন সমাজের দর্পণ। এগুলি কেবল পণ্য প্রচারের মাধ্যম ছিল না, বরং বাঙালির দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল। এই ধরনের বিজ্ঞাপনগুলি এক নীরব সাক্ষী হিসেবে কাজ করেছে, যা সময়ের সাথে সাথে হারিয়ে গেছে এবং এর নির্মাতারাও রয়ে গেছেন প্রায় অজ্ঞাত।

এই হারিয়ে যাওয়া শিল্প ও শিল্পীদের অন্বেষণ অনেকটা টিউডর পারফিটের ‘দ্য লস্ট ট্রাইবস অব ইসরায়েল’ বইয়ের কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে ইসরায়েলের হারানো উপজাতিদের খোঁজে অভিযান চালানো হয়েছিল। একইভাবে, প্রেমেন্দ্র মিত্রের কালীঘাটের পটুয়াদের হারিয়ে যাওয়ার গল্পও প্রাসঙ্গিক। এসব বিজ্ঞাপনের পেছনের অসংখ্য শিল্পী, যাদের নাম বা পরিচয় আজ প্রায় অজানা, তারা যেন এই হারিয়ে যাওয়া উপজাতি বা পটুয়াদেরই উত্তরসূরি। তাদের বেশিরভাগই কখনো নিজেদের স্বাক্ষর রাখার সুযোগ পাননি, আর যারা রেখেছিলেন, তাদের নামও অনেক সময় এজেন্সি কর্তৃক মুছে ফেলা হতো।

শিল্প সমালোচকদের একাংশ, যেমন শিল্পী রঘুনাথ গোস্বামী, এই ধরনের বিজ্ঞাপন চিত্রকে ‘শিল্প বস্তুর নির্বোধ এবং নির্বিচার সরলীকরণ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাদের মতে, এগুলিতে শিল্পমূল্য বা নান্দনিকতা নেই। তবে, গভীর দৃষ্টিতে দেখলে এই আপাত ‘কদর্য’ বিজ্ঞাপনচিত্রগুলিতেও প্রচুর হাস্যরস, বেদনা এবং তৎকালীন সমাজের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাওয়া যায়। দাদের মলম বা চুল গজানোর টনিকের বিজ্ঞাপনগুলিও সেই সময়ের মানুষের চাহিদা, বিশ্বাস এবং জীবনযাপনের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এগুলি উচ্চাঙ্গের শিল্প না হলেও, বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের মূল্যবান উপাদান।

মানসিক রোগের চিকিৎসার বিজ্ঞাপনগুলি এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৫২ সালের একটি বিজ্ঞাপনে ‘এবিডি পিলস’ এবং ‘দত্ত অয়েল’ দিয়ে মানসিক অসুস্থতা সারানোর দাবি করা হয়েছিল, যার প্রধান কার্যালয় ছিল ২৯-এ বিবেকানন্দ রোড, জোড়াসাঁকোতে। জোড়াসাঁকোর নাম আসতেই মনে পড়ে ঠাকুর পরিবারের কথা, যেখানে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের চতুর্থ পুত্র বীরেন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্রনাথের ভাই সোমেন্দ্রনাথ মানসিক অস্থিরতায় ভুগেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই নাকি ‘এস. সি. রায় অ্যান্ড কোং’-এর ‘পাগল সারানোর মহৌষধ’-এর কার্যকারিতা সম্পর্কে অবগত ছিলেন বলে বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছিল। এই বিজ্ঞাপনগুলি কেবল বাণিজ্যিক প্রচার ছিল না, বরং তৎকালীন চিকিৎসাব্যবস্থা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপরও আলোকপাত করে।

কলকাতায় বিজ্ঞাপন শিল্পের গোড়াপত্তন ঘটে ১৯২০-এর দশকে, যেখানে ১৯২৮ সালে ‘প্যারাডাইস অ্যাডভার্টাইজিং’ এবং ১৯৩৭ সালে ‘স্ট্রোনাচ অ্যাডভার্টাইজিং’-এর মতো সংস্থাগুলি গড়ে ওঠে। ও.সি. গাঙ্গুলীর মতো কিংবদন্তি শিল্পীরা সে সময় মাসিক চল্লিশ টাকা বেতনে কাজ করতেন। তবে, দেশভাগের আগে পূর্ব বাংলায় (বর্তমান বাংলাদেশ) তেমন কোনো আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞাপন সংস্থার অস্তিত্ব ছিল না। স্থানীয় ছোট ব্যবসায়ীরা প্রায়শই এজেন্সিগুলোতে না গিয়ে স্থানীয় শিল্পীদের দিয়ে ‘কদর্য’ (আধুনিক মানদণ্ডে) চিত্র তৈরি করিয়ে সংবাদপত্রে ছাপাতেন। এসব বিজ্ঞাপনের হস্তলিপি প্রায়শই অপেশাদারী ছিল, যা পেশাদার সংস্থার মানদণ্ড পূরণ করতো না।

বাংলার এই বিস্মৃত বিজ্ঞাপন শিল্পকে পুনরায় আবিষ্কার করা কেবল ইতিহাসের পাতা উল্টানো নয়, বরং এক হারানো সাংস্কৃতিক অধ্যায়কে পুনরুদ্ধার করা। এই চিত্রগুলি কেবল পণ্য বিক্রির জন্য তৈরি হয়নি, বরং এগুলি বাংলার সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক বিবর্তনের অমূল্য সাক্ষী। এই শিল্পকর্মগুলিকে যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান এবং সংরক্ষণ করা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অপরিহার্য, যাতে তারা তাদের পূর্বপুরুষদের জীবনযাত্রা এবং শিল্পচেতনা সম্পর্কে অবগত হতে পারে।