ঢাকা, [তারিখ]: বাংলাদেশের তিস্তা নদীর পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে চীনের সহযোগিতা কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয় বলে সম্প্রতি স্পষ্ট জানিয়েছে বেইজিং। এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো যখন তিস্তা প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত জলবণ্টন চুক্তির প্রেক্ষাপটে চীনের সম্ভাব্য জড়িত হওয়া নিয়ে ভূ-রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা চলছে। চীনের এই বার্তা মূলত ভারতসহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের উদ্বেগ প্রশমনের একটি কূটনৈতিক প্রয়াস বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তিস্তা নদী বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকার উৎস। কৃষিকাজ, মৎস্য আহরণ এবং সামগ্রিক পরিবেশের জন্য এই নদীর পানি অপরিহার্য। শুষ্ক মৌসুমে উজানে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশের অংশে তিস্তার প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যায়, যা কৃষি ও পরিবেশে বিরূপ প্রভাব ফেলে। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি ঝুলে আছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জটিলতার কারণে এই চুক্তি বারবার পিছিয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ বিকল্প সমাধান খুঁজতে বাধ্য হয়।
এই প্রেক্ষাপাপটেই চীনের ‘তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’ (Teesta River Comprehensive Management Project – TRCMP) প্রস্তাবটি বাংলাদেশের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রাথমিকভাবে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পে তিস্তা নদীর ড্রেজিং, তীর সংরক্ষণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং একটি আধুনিক ব্যারেজ নির্মাণসহ ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজের প্রস্তাব রয়েছে। এটি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের পানি সংকটের একটি দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই সমাধান দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার এই চীনা প্রস্তাবকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছে এবং এর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলমান রয়েছে।
তবে তিস্তা প্রকল্পে চীনের জড়িত হওয়া ভারতের জন্য সংবেদনশীল একটি বিষয়। ভারত ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশকে তার প্রভাব বলয়ের অংশ মনে করে এবং এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করে। তিস্তার মতো একটি কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে চীনের অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা ভারতের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ভারসাম্যের জন্য উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। ভারত আশঙ্কা করে যে, চীনা বিনিয়োগের আড়ালে কৌশলগত সুবিধা অর্জন বা ‘ঋণ ফাঁদ’ তৈরি হতে পারে, যেমনটি শ্রীলঙ্কা বা পাকিস্তানের ক্ষেত্রে দেখা গেছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তিস্তার পানি সংকট মোকাবিলায় একটি কার্যকর সমাধানের জন্য বাংলাদেশ যেকোনো বন্ধুত্বপূর্ণ দেশ থেকে সহযোগিতা নিতে প্রস্তুত। ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেও বাংলাদেশ তার উন্নয়ন চাহিদা পূরণে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়তে বদ্ধপরিকর। বেইজিং-এর সাম্প্রতিক ঘোষণা, যে তাদের সহযোগিতা কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয়, তা মূলত বাংলাদেশের এই অবস্থানকে সমর্থন করে এবং সম্ভাব্য কূটনৈতিক উত্তেজনা প্রশমনের একটি প্রচেষ্টা। এর মাধ্যমে চীন বোঝাতে চাইছে যে তাদের উদ্দেশ্য কেবল বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী হওয়া, কোনো ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তিস্তা প্রকল্প নিয়ে চীনের এই স্পষ্ট বার্তা আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে একটি ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা। এটি একদিকে যেমন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়নের অধিকারকে সম্মান জানায়, অন্যদিকে ভারতের উদ্বেগকে পরোক্ষভাবে প্রশমিত করার একটি উদ্যোগ। তবে, এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ গতিপথ এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে এর প্রভাব কেমন হবে, তা সময়ই বলে দেবে। বাংলাদেশের জন্য, তিস্তা নদীর টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।
রিপোর্টার নাম: 
















