Hi

০৩:৪৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিচ্ছবি: মোহাম্মদ তাওকীর ইসলামের চলচ্চিত্র ‘দেলুপি’র উন্মুক্ত প্রদর্শনী

  • রিপোর্টার নাম:
  • আপডেট : ১২:২৩:১৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬
  • ৩ জন দেখেছে

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মূল মিলনায়তনে সম্প্রতি নির্মাতা মোহাম্মদ তাওকীর ইসলামের বহুল আলোচিত চলচ্চিত্র ‘দেলুপি’র একটি বিশেষ উন্মুক্ত প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ৭ নভেম্বর মুক্তি পাওয়া এই সিনেমাটি মুক্তির পর থেকেই দর্শক ও চলচ্চিত্র সমালোচকদের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর পাশাপাশি ‘জুলাইয়ের গণ–অভ্যুত্থান ও চলচ্চিত্রের রাজনৈতিক ভূমিকা’ শীর্ষক এক তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। এই আয়োজনে দেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, কবি, লেখক, শিক্ষক ও গবেষকগণ অংশ নিয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং এর পরবর্তী রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার ওপর চলচ্চিত্রের প্রভাব নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন।

আলোচনা সভায় প্রথিতযশা কবি ও প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ বলেন, ‘দেলুপি’ সিনেমাটিতে আমাদের সাম্প্রতিক ইতিহাসের এক বিশেষ সময়ের গভীর ছাপ রয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলে সংঘটিত নানা ঘটনার বাস্তব প্রতিফলন এই চলচ্চিত্রে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। সিনেমাটির প্রেক্ষাপটকে একটি নির্দিষ্ট গ্রামের গণ্ডিতে আটকে না রেখে বৃহত্তর বাংলাদেশের রূপক হিসেবে দেখা যেতে পারে। যেখানে ক্ষমতার হাতবদল ঘটলেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভাগ্য বা কাঠামোগত বাস্তবতার কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসেনি। একই সঙ্গে ওই সময়ে দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অবস্থান এবং সামগ্রিক সংস্কৃতিচর্চার চিত্রও অত্যন্ত সাবলীলভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ভবিষ্যতে যখনই গবেষক বা সাধারণ মানুষ জুলাই আন্দোলনের প্রকৃত স্বরূপ অনুধাবন করতে চাইবেন, তখন এই চলচ্চিত্রটি একটি ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে কাজ করবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

অনুষ্ঠানে লেখক ও নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবির তাঁর বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশ যে ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে, তার অন্তর্নিহিত গতিবেগ এবং তাৎপর্য সেলুলয়েডের ফ্রেমে ধারণ করার এক সাহসী প্রয়াস হলো এই ‘দেলুপি’। অন্যদিকে, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের অধ্যাপক বখতিয়ার আহমেদ চলচ্চিত্রটির শৈল্পিক ও নান্দনিক দিক তুলে ধরে বলেন, এটি অত্যন্ত সহজ ও অকপট একটি নির্মাণ। চিরাচরিত কেন্দ্রায়িত বয়ানের বাইরে গিয়ে সিনেমাটি একটি ক্ষুদ্র সামাজিক বা মাইক্রোসোশ্যাল প্রেক্ষাপট উপস্থাপন করেছে। চব্বিশের বিপ্লব নিয়ে নির্মিত অন্যান্য প্রথাগত চলচ্চিত্র থেকে এটি সম্পূর্ণ আলাদা, কারণ এটি কোনো বিশাল বা গ্র্যান্ড ন্যারেটিভের পেছনে ছোটে নি; বরং রোদে পোড়া ও কাদাজলে ভেজা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ক্ষুদ্র অথচ সত্য ঘটনাগুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে।

প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) সহযোগী অধ্যাপক মনিরা শরমিন তাঁর বক্তব্যে বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের সমাপ্তি যেখানে ঘটেছে, ঠিক সেই বিন্দু থেকেই এই চলচ্চিত্রের সূচনা হয়েছে। আগামী দিনে যখন জুলাইয়ের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচিত হবে, তখন ‘দেলুপি’কে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না। রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে নতুন প্রজন্ম বা জেন-জিদের যে সুদূরপ্রসাুরী স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষা ছিল, তার বাস্তবরূপ এই চলচ্চিত্রে অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। প্রদর্শনীতে প্রধান আকর্ষণ হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি। তিনি দর্শকদের সাথে সিনেমাটি উপভোগ করার পর মঞ্চে এসে বলেন, যেকোনো গণআন্দোলন মানুষকে নতুন সত্তায় রূপান্তরিত করে। চলচ্চিত্রের বিভিন্ন চরিত্রে যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, তা আমাদের সামাজিক বিবর্তনেরই একটি অংশ।

অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এবং শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদসহ দেশের শিল্প ও সংস্কৃতি অঙ্গনের বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। প্রদর্শনী শেষে পরিচালক মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম তাঁর কলাকুশলীদের নিয়ে মঞ্চে আসেন এবং দেশের আরও বেশি দর্শকের কাছে এই চলচ্চিত্রের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। ওয়ার্ল্ড সিনে সার্কেল, সিনেফিল সোসাইটি বাংলাদেশ এবং সুন্দরবন ফিল্ম সোসাইটি যৌথভাবে এই প্রদর্শনীর আয়োজন করে। অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত সাবলীলভাবে সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নুর উল্লাহ। সার্বিক বিবেচনায় ‘দেলুপি’ কেবল একটি বিনোদনমূলক চলচ্চিত্র নয়, বরং এটি জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরের এক প্রামাণ্য দলিল হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে নিয়েছে।

জনপ্রিয়

পরলোকগত হলেন সাবেক হাইকমিশনার ও অতিরিক্ত পররাষ্ট্রসচিব ফেরদৌসি শাহরিয়ার

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিচ্ছবি: মোহাম্মদ তাওকীর ইসলামের চলচ্চিত্র ‘দেলুপি’র উন্মুক্ত প্রদর্শনী

আপডেট : ১২:২৩:১৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মূল মিলনায়তনে সম্প্রতি নির্মাতা মোহাম্মদ তাওকীর ইসলামের বহুল আলোচিত চলচ্চিত্র ‘দেলুপি’র একটি বিশেষ উন্মুক্ত প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ৭ নভেম্বর মুক্তি পাওয়া এই সিনেমাটি মুক্তির পর থেকেই দর্শক ও চলচ্চিত্র সমালোচকদের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর পাশাপাশি ‘জুলাইয়ের গণ–অভ্যুত্থান ও চলচ্চিত্রের রাজনৈতিক ভূমিকা’ শীর্ষক এক তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। এই আয়োজনে দেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, কবি, লেখক, শিক্ষক ও গবেষকগণ অংশ নিয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং এর পরবর্তী রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার ওপর চলচ্চিত্রের প্রভাব নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন।

আলোচনা সভায় প্রথিতযশা কবি ও প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ বলেন, ‘দেলুপি’ সিনেমাটিতে আমাদের সাম্প্রতিক ইতিহাসের এক বিশেষ সময়ের গভীর ছাপ রয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলে সংঘটিত নানা ঘটনার বাস্তব প্রতিফলন এই চলচ্চিত্রে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। সিনেমাটির প্রেক্ষাপটকে একটি নির্দিষ্ট গ্রামের গণ্ডিতে আটকে না রেখে বৃহত্তর বাংলাদেশের রূপক হিসেবে দেখা যেতে পারে। যেখানে ক্ষমতার হাতবদল ঘটলেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভাগ্য বা কাঠামোগত বাস্তবতার কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসেনি। একই সঙ্গে ওই সময়ে দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অবস্থান এবং সামগ্রিক সংস্কৃতিচর্চার চিত্রও অত্যন্ত সাবলীলভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ভবিষ্যতে যখনই গবেষক বা সাধারণ মানুষ জুলাই আন্দোলনের প্রকৃত স্বরূপ অনুধাবন করতে চাইবেন, তখন এই চলচ্চিত্রটি একটি ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে কাজ করবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

অনুষ্ঠানে লেখক ও নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবির তাঁর বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশ যে ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে, তার অন্তর্নিহিত গতিবেগ এবং তাৎপর্য সেলুলয়েডের ফ্রেমে ধারণ করার এক সাহসী প্রয়াস হলো এই ‘দেলুপি’। অন্যদিকে, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের অধ্যাপক বখতিয়ার আহমেদ চলচ্চিত্রটির শৈল্পিক ও নান্দনিক দিক তুলে ধরে বলেন, এটি অত্যন্ত সহজ ও অকপট একটি নির্মাণ। চিরাচরিত কেন্দ্রায়িত বয়ানের বাইরে গিয়ে সিনেমাটি একটি ক্ষুদ্র সামাজিক বা মাইক্রোসোশ্যাল প্রেক্ষাপট উপস্থাপন করেছে। চব্বিশের বিপ্লব নিয়ে নির্মিত অন্যান্য প্রথাগত চলচ্চিত্র থেকে এটি সম্পূর্ণ আলাদা, কারণ এটি কোনো বিশাল বা গ্র্যান্ড ন্যারেটিভের পেছনে ছোটে নি; বরং রোদে পোড়া ও কাদাজলে ভেজা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ক্ষুদ্র অথচ সত্য ঘটনাগুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে।

প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) সহযোগী অধ্যাপক মনিরা শরমিন তাঁর বক্তব্যে বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের সমাপ্তি যেখানে ঘটেছে, ঠিক সেই বিন্দু থেকেই এই চলচ্চিত্রের সূচনা হয়েছে। আগামী দিনে যখন জুলাইয়ের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচিত হবে, তখন ‘দেলুপি’কে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না। রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে নতুন প্রজন্ম বা জেন-জিদের যে সুদূরপ্রসাুরী স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষা ছিল, তার বাস্তবরূপ এই চলচ্চিত্রে অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। প্রদর্শনীতে প্রধান আকর্ষণ হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি। তিনি দর্শকদের সাথে সিনেমাটি উপভোগ করার পর মঞ্চে এসে বলেন, যেকোনো গণআন্দোলন মানুষকে নতুন সত্তায় রূপান্তরিত করে। চলচ্চিত্রের বিভিন্ন চরিত্রে যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, তা আমাদের সামাজিক বিবর্তনেরই একটি অংশ।

অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এবং শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদসহ দেশের শিল্প ও সংস্কৃতি অঙ্গনের বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। প্রদর্শনী শেষে পরিচালক মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম তাঁর কলাকুশলীদের নিয়ে মঞ্চে আসেন এবং দেশের আরও বেশি দর্শকের কাছে এই চলচ্চিত্রের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। ওয়ার্ল্ড সিনে সার্কেল, সিনেফিল সোসাইটি বাংলাদেশ এবং সুন্দরবন ফিল্ম সোসাইটি যৌথভাবে এই প্রদর্শনীর আয়োজন করে। অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত সাবলীলভাবে সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নুর উল্লাহ। সার্বিক বিবেচনায় ‘দেলুপি’ কেবল একটি বিনোদনমূলক চলচ্চিত্র নয়, বরং এটি জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরের এক প্রামাণ্য দলিল হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে নিয়েছে।