ইরানের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, যেখানে তিনি বলেছেন যে, ওয়াশিংটন যদি তাদের পূর্বের সমঝোতা স্মারক বা চুক্তি মেনে চলে, তবেই তেহরানও নিজেদের প্রতিশ্রুতি পূরণে সচেষ্ট হবে। সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বার্তায় প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান এই দ্বিপক্ষীয় বোঝাপড়ার ওপর জোর দেন। তার এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান পারমাণবিক আলোচনা এবং সমঝোতা বাস্তবায়নের বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান তার বার্তায় আরও উল্লেখ করেন, “বোঝাপড়া একটি দ্বিপক্ষীয় বিষয়। যুক্তরাষ্ট্র যদি সমঝোতা স্মারক মেনে চলে, তাহলে আমরাও আমাদের দায়িত্ব ও প্রতিশ্রুতি পালন করবো।” তিনি অযৌক্তিক দম্ভ এবং ভিত্তিহীন হুমকির জবাবে ইরানের নীতি ব্যাখ্যা করে বলেন যে, তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্তিবাদ ও মানবিক মর্যাদাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। একইসাথে, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের ক্ষেত্রে তেহরান দৃঢ় ও নির্ভীকভাবে নিজেদের অবস্থান রক্ষা করবে। তার এই বক্তব্য ইরানের বিদেশনীতিতে নতুন প্রশাসনের সংযত অথচ দৃঢ় অবস্থানের ইঙ্গিত বহন করে, যা পারমাণবিক চুক্তির (JCPOA) ভবিষ্যৎ নিয়ে চলমান অনিশ্চয়তার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের এই ‘সমঝোতা স্মারক’ বলতে সম্ভবত ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অফ অ্যাকশন (JCPOA) বা ইরান পারমাণবিক চুক্তিকেই বোঝানো হয়েছে। এই চুক্তি অনুযায়ী, ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিনিময়ে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পেয়েছিল। তবে, ২০১৮ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবে এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন এবং ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা পুনরায় আরোপ করেন। এর ফলস্বরূপ, ইরানও ধীরে ধীরে চুক্তির শর্তগুলো লঙ্ঘন করতে শুরু করে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করে। পেজেশকিয়ানের শর্তারোপ তাই মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি চুক্তিতে ফিরে আসার এবং তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণের একটি আহ্বান।
এদিকে, এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন। তিনি তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এক পোস্টে জানান যে, তেহরান আলোচনার অনুরোধ করার পর মঙ্গলবার কাতারের রাজধানী দোহায় ইরানের সঙ্গে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ট্রাম্পের এই দাবি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে, কারণ তিনি আর ক্ষমতায় না থাকলেও তার মন্তব্য এখনও প্রভাবশালী। তবে, ট্রাম্পের এই দাবির পরপরই ইরান দ্রুত এর বিরোধিতা করে। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, চলতি সপ্তাহে কাতারে মার্কিন ‘টেকনিক্যাল টিমের’ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করার বিষয়ে বর্তমানে তাদের কোনো পরিকল্পনা নেই। এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য সম্ভাব্য আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করেছে।
ট্রাম্পের দাবি এবং ইরানের অস্বীকারের মধ্যে এই স্পষ্ট বিরোধ ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আস্থার অভাবকে আরও প্রকট করে তুলেছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, পর্দার আড়ালে কোনো আলোচনা চললেও, তা এখনও জনসম্মুখে আসার মতো অবস্থায় নেই, অথবা দুই পক্ষই ভিন্ন ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই ধরনের দাবি বর্তমান বাইডেন প্রশাসনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে প্রভাবিত করতে পারে বলেও অনেকে মনে করছেন। ইরান দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তাদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছে এবং যেকোনো আলোচনার পূর্বশর্ত হিসেবে এটিকে দেখছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক প্রভাব সীমিত করার ওপর জোর দিচ্ছে। এই জটিল সমীকরণ এবং আস্থার সংকট আগামী দিনে দুই দেশের মধ্যে যেকোনো ফলপ্রসূ আলোচনাকে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তুলবে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। আল-জাজিরা এমএসএম সূত্রে এই খবর পাওয়া গেছে।
রিপোর্টার নাম: 















