ভোলার চরফ্যাশন আইনজীবী সমিতির অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) অ্যাডভোকেট মো. হযরত আলী হিরনের সদস্যপদ ছয় মাসের জন্য স্থগিত করেছে সমিতি। পাশাপাশি কেন তার সদস্যপদ স্থায়ীভাবে বাতিল করা হবে না, তা জানতে চেয়ে একটি কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করা হয়েছে। নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে তাকে এ বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দাখিল করতে হবে। অন্যথায় গঠনতন্ত্র মোতাবেক তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাত দিনের মধ্যে তাকে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে।
নোটিশের প্রেক্ষাপট ও কার্যকরীকরণ
চরফ্যাশন আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ রমিজ উদ্দিন এবং সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. লিটন হাওলাদারের যৌথ স্বাক্ষরে গত ৫ অক্টোবর এই নির্দেশনা জারি করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, ৬ অক্টোবর থেকেই সদস্যপদ স্থগিতের সিদ্ধান্তটি কার্যকর হয়েছে। সমিতি সূত্রে জানা যায়, হযরত আলী হিরনের বিরুদ্ধে এর আগেও গঠনতন্ত্রের ধারা লঙ্ঘন, অর্থের বিনিময়ে রায় পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি, জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, মক্কেলের নথিপত্র আত্মসাৎ এবং হত্যার হুমকির মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ ওঠায় বারবার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হয়েছে সমিতিকে।
অতীতের শৃঙ্খলাভঙ্গ ও মুচলেকা
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২১ সালের ২৫ মার্চ গঠনতন্ত্রের ৪০ ধারা ভঙ্গের দায়ে প্রথমবারের মতো তার সদস্যপদ দুই মাসের জন্য স্থগিত করা হয়েছিল। একই বছরের ১৬ নভেম্বর একটি দেওয়ানি মামলায় রায় অনুকূলে নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ১২ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়। সেই ঘটনায় তার সদস্যপদ ফের ছয় মাসের জন্য স্থগিত করা হয়। ২০২২ সালের ২৪ এপ্রিল হযরত আলী ভবিষ্যতে পেশাগত কোনো অসদাচরণ করবেন না মর্মে সমিতির কাছে লিখিত মুচলেকা প্রদান করেন। সেই মুচলেকায় আশ্বস্ত হয়ে তাকে আবারও পেশাগত কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
সাম্প্রতিক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড
মুচলেকা দেওয়ার পরও তার আচরণে কোনো পরিবর্তন আসেনি বলে অভিযোগ ওঠে। গত বছরের ৭ আগস্ট সমিতির সভাকক্ষে জ্যেষ্ঠ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. শাহাবুদ্দিন মালতিয়ার সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও তাকে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগে তিন মাসের জন্য তার সদস্যপদ স্থগিত করা হয়েছিল। এরপর ৩১ আগস্ট চরফ্যাশন যুগ্ম জেলা জজ আদালতে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. হাবিবুর রহমান সোহানের সঙ্গে অসদাচরণ করেন তিনি। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি হাবিবুর রহমানের কাছ থেকে মামলার নথিপত্র ও মক্কেলের পাসবই জোরপূর্বক নিয়ে যান। এই ঘটনায় ভুক্তভোগী আইনজীবী সমিতির কাছে অভিযোগ জানালে ভিজিল্যান্স কমিটি তদন্তে ঘটনার সত্যতা পায়। এরপর তাকে আবার সমিতির সদস্য হিসেবে কার্যক্রম চালানোর সুযোগ দেওয়া হয়। তবে ২০২৫ সালের ৭ আগস্ট সমিতির সভাকক্ষে জ্যেষ্ঠ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. শাহাবুদ্দিন মালতিয়ার সঙ্গে অসদাচরণ ও হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
সর্বশেষ ঘটনা ও বর্তমান অবস্থান
সর্বশেষ গত ৪ অক্টোবর সমিতির কার্যালয়ে সাধারণ সভা চলাকালীন জিআর ১৬১/২৬ মামলার আসামির জামিন আবেদন নিয়ে হট্টগোল সৃষ্টি করেন হযরত আলী। সেখানে জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের গালমন্দ এবং জামিন প্রার্থনার কাজে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর কার্যনির্বাহী কমিটি ছয় মাসের সদস্যপদ স্থগিতের কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়। সাধারণ সম্পাদক লিটন হাওলাদার জানান, বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও একই ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখায় সমিতির শৃঙ্খলা রক্ষার্থে এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। এদিকে, অভিযোগের বিষয়ে হযরত আলী হিরনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি, তাই তার মন্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।