অল্প পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে যাওয়া কিংবা সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় দম বন্ধ হওয়ার মতো অনুভূতি হওয়া হৃদরোগের অন্যতম উপসর্গ হতে পারে। অনেকেই এসব সমস্যাকে বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন ভেবে অবহেলা করেন, কিন্তু এগুলো অনেক সময় হৃদপিণ্ডের জটিলতার আগাম সংকেত হিসেবে কাজ করে। যেমন, একজন রোগী আগে অনায়াসে প্রতিদিন বিকেলে হাঁটাহাঁটি করতে পারলেও বর্তমানে সামান্য পরিশ্রমেই বুকে ভারী ভাব ও হাঁপিয়ে ওঠার মতো সমস্যায় ভুগছেন। তাঁর স্ত্রী জানান, তিন-চারতলা সিঁড়ি ভাঙার পর রোগীর শ্বাসকষ্ট বা দম বন্ধ হয়ে আসার অনুভূতি আরও তীব্র হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এমন পরিস্থিতিতে অত্যন্ত জরুরি। পঞ্চাশোর্ধ এক রোগী বলছিলেন কথাগুলো। উদ্বিগ্ন স্বামী-স্ত্রীর প্রশ্ন, এসব উপসর্গ কি হার্টের সমস্যার জন্য হচ্ছে। ‘আগের মতো হাঁটতে পারছি না’, ‘সামান্য কাজেই হাঁপিয়ে যাচ্ছি’, ‘অল্প পরিশ্রমেই বুক ধড়ফড় করছে’, ‘সিঁড়ি উঠলেই দম বন্ধ হয়ে আসে’ কিংবা ‘শরীরটা কেমন যেন দুর্বল আর ক্লান্ত লাগে’—এসব অভিযোগ অনেকেরই। কেউ আবার এসবকে বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন বলে বিশেষ পাত্তা দেন না। ফলে ব্যক্তি স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারেন।

আমাদের হৃদপিণ্ড যেমন সংবেদনশীল, তেমনি দারুণ সহনশীল। হৃদ্‌যন্ত্রে কোনো গোলযোগ শুরু হলেও শরীর অনেক সময় তা দীর্ঘদিন সামলে নিতে পারে, ফলে উপসর্গগুলো শুরুতে তেমন স্পষ্ট হয় না। রক্তনালিতে ধীরে ধীরে চর্বি ও কোলেস্টেরল জমলে রক্তনালি সরু হয়ে আসে। প্রাথমিকভাবে শরীর এই পরিস্থিতি মানিয়ে নিলেও পরিশ্রমের সময় হৃদপিণ্ডে রক্ত সঞ্চালনের চাহিদাও বেড়ে যায়। তখন সরু রক্তনালির কারণে পর্যাপ্ত রক্ত না পৌঁছালে বুকে চাপ বা ভারী অনুভূতির মতো সমস্যা দেখা দেয়। এটি যেমন সংবেদনশীল, তেমনি আশ্চর্য রকম সহনশীলও। আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে রক্তনালির ভেতরের চর্বিযুক্ত আস্তরণে হঠাৎ ফাটল তৈরি হয়ে সেখানে রক্ত জমাট বাঁধে।

হৃদরোগের প্রধান উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে শারীরিক পরিশ্রম বা হাঁটার সময় বুকে অস্বস্তি, শ্বাসকষ্ট হওয়া, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, মাথা ঘোরানো কিংবা পা ও গোড়ালি ফুলে যাওয়া। এছাড়া শুয়ে থাকার সময় শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া এবং কাজের ক্ষমতা আগের তুলনায় আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়াকেও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। তবে মনে রাখা প্রয়োজন যে, এসব উপসর্গ মানেই যে হৃদরোগ, তা নয়। রক্তস্বল্পতা, থাইরয়েড সমস্যা, ফুসফুসের রোগ বা অতিরিক্ত উদ্বেগের কারণেও এমনটা হতে পারে। সঠিক রোগ নির্ণয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক।

যাঁদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল কিংবা পরিবারের সদস্যদের হৃদরোগের ইতিহাস রয়েছে, তাঁদের ঝুঁকি অনেক বেশি। ধূমপায়ী বা অতিরিক্ত স্থূল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। মনে রাখবেন, ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের হৃদরোগের লক্ষণ সবসময় স্পষ্ট হয় না। তাই ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের সামান্য অস্বাভাবিকতাকেও অবহেলা করা উচিত নয়।

হৃদরোগ নির্ণয়ের জন্য প্রথমেই রোগীর বিস্তারিত শারীরিক ইতিহাস ও লক্ষণ বিশ্লেষণ করা হয়। রক্তচাপ ও হৃৎস্পন্দন পরীক্ষার পর প্রয়োজন অনুযায়ী ইসিজি বা ইকোকার্ডিওগ্রামের মতো পরীক্ষা দেওয়া হয়। তবে স্বাভাবিক রিপোর্ট এলেও রক্তনালিতে ব্লকেজ নেই, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। চিকিৎসক রোগীর ঝুঁকির ধরন বুঝে ট্রেডমিল টেস্ট, সিটি করোনারি এনজিওগ্রাম বা ইনভেসিভ এনজিওগ্রামের পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

চিকিৎসার ধরন নির্ভর করে ব্লকেজের মাত্রা ও অবস্থানের ওপর। কারো ক্ষেত্রে কেবল ওষুধেই কাজ হয়, আবার কারো এনজিওপ্লাস্টি বা রিং স্থাপন কিংবা বাইপাস সার্জারির প্রয়োজন হতে পারে। এ ছাড়া রক্তে গ্লুকোজ ও কোলেস্টেরলের মাত্রাও পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। অযথা নিজের ইচ্ছেমতো অনেক পরীক্ষা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক পরীক্ষা করানোই বুদ্ধিমানের কাজ।

বুকের অস্বস্তি তীব্র হলে, বিশ্রামের পরও ব্যথা না কমলে কিংবা সঙ্গে ঠান্ডা ঘাম, বমি ভাব বা অচেতন হওয়ার লক্ষণ থাকলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবা নিতে হবে। হৃদরোগ প্রতিরোধে ধূমপান পরিহার, সুষম খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত ঘুম জরুরি। এমনকি প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন ও চিকিৎসার মাধ্যমে বড় ধরনের হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধ করা সম্ভব। সময়মতো সতর্কতাই এই নীরব ঘাতক থেকে আপনাকে রক্ষা করতে পারে। এই ব্লকের কারণে রক্তপ্রবাহ গুরুতরভাবে বাধাগ্রস্ত হলে ঘটতে পারে আকস্মিক হার্ট অ্যাটাক।