দেশে দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং প্রযুক্তিগত সেবাকে সহজলভ্য করার লক্ষ্যে সরকার প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সব ধরনের সহায়তা প্রদানের পরিকল্পনা নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, এ লক্ষ্য পূরণে বিদ্যমান কর নীতি, বিনিয়োগ পরিকল্পনা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হচ্ছে। গত রোববার যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সিডার হলে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ-সিলিকন ভ্যালি প্রযুক্তি সংলাপ’-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। মূল শিক্ষাব্যবস্থায় প্রয়োগের আগে নতুন শিক্ষাপদ্ধতিগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

লস অ্যাঞ্জেলেসে অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল আয়োজিত ‘বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য প্রযুক্তি, মেধা ও অংশীদারিত্ব’ শীর্ষক এই সংলাপে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ প্রতিনিধি দলের সদস্যরা অংশ নেন। এতে সিলিকন ভ্যালির শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, গবেষক, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী এবং প্রবাসী বাংলাদেশিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য ও সঞ্চালনা করেন কনসাল জেনারেল কাজী মুহাম্মদ জাবেদ ইকবাল, পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক মো. আরিফুল ইসলামও বক্তব্য রাখেন।

ড. তিতুমীর জোর দিয়ে বলেন, প্রযুক্তিগত সহযোগিতার মূল উদ্দেশ্য হতে হবে নাগরিক সেবার মান বাড়ানো এবং দেশের সাধারণ মানুষের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করা। তিনি উপস্থিত অংশীজনদের প্রতি আহ্বান জানান, যেন দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্প, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান এবং পরবর্তী কার্যক্রমগুলো সুনির্দিষ্ট করা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি দলে আরও ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। সংলাপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, গবেষণা ও দক্ষতা উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আলোচকেরা গবেষণা, দক্ষতা উন্নয়ন, শিল্প খাতের অংশীদারত্ব এবং বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে মতবিনিময় করেন।

প্রযুক্তি ও মেধা নিয়ে আয়োজিত প্যানেল আলোচনায় ড. সাইফ ইসলাম, ড. শতিল হক, ড. ইউসুফ হক, ড. ওমর ইশরাক, মোহাম্মদ এনায়েতুর রহমান ও বদরুল সারওয়ারের মতো বিশেষজ্ঞগণ অংশ নেন। তারা গবেষণা ও শিল্প খাতের মধ্যে শক্তিশালী সেতুবন্ধন তৈরির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ডেভিসের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাইফ ইসলাম মেধা, প্রযুক্তি ও পুঁজি বিষয়ে প্যানেল আলোচনা সঞ্চালনা করেন।

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ জানান, সরকার শিক্ষা, স্টার্টআপ এবং শিল্প খাতের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে বদ্ধপরিকর। বিএইআর সামিটসহ সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের প্রযুক্তিগত মেধাকে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে রূপান্তরিত করাই বর্তমান সরকারের লক্ষ্য। প্যানেলে অংশ নেন উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, ক্রিডো সেমিকন্ডাক্টরের ড. শতিল হক, এক্সোর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ড. ইউসুফ হক, মেডট্রনিকের সাবেক প্রধান নির্বাহী ও ইন্টেলের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক চেয়ারম্যান।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কূটনীতিকে পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত গবেষণা ও উদ্ভাবন ব্যবস্থার সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার করা হলে তা কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তাসহ বিভিন্ন জাতীয় সমস্যা সমাধানে বড় ভূমিকা রাখবে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ ডিজিটাল দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি মৌলিক শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি শিক্ষকদের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষে এআইয়ের সঠিক প্রয়োগ এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কাছে মানসম্মত শিক্ষা উপকরণ পৌঁছানোর বিষয়ে আলোকপাত করেন। তাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগ ও সহযোগিতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

অনুষ্ঠানে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ, ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. শরিফা সুলতানা, উবারের প্রকৌশলী ড. মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম এবং এনভিডিয়ার গবেষক ড. মোস্তফা পাটোয়ারী এআই ব্যবহারের ওপর প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এছাড়া গ্লোবালফাউন্ড্রিজের ড. মাহবুব রাশেদ সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন। বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল এই ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে প্রযুক্তি খাতে দীর্ঘমেয়াদী কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে।