বাংলাদেশের শ্রম আইন সংস্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন আর আইন পরিবর্তন হয়েছে কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো সংশোধিত আইনে যে অধিকার দেওয়া হয়েছে, শ্রমিক বাস্তবে কতটা তা ভোগ করতে পারবেন। ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার থাকলেও যদি ইউনিয়ন করতে গিয়ে চাকরি হারানোর ভয় থাকে, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি নিষিদ্ধ হলেও অভিযোগের নিরাপদ ব্যবস্থা যদি না থাকে, নিরাপত্তার বিধান থাকলেও পরিদর্শন ও শাস্তি যদি কার্যকর না হয়, তাহলে আইনের পরিবর্তন শ্রমিকের জীবনে কতটা পরিবর্তন আনবে? এই প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ২০০৬ সালের শ্রম আইন থেকে ২০২৬ সালের সংশোধিত কাঠামোতে পৌঁছাতে বাংলাদেশকে দীর্ঘ ও জটিল পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। ২০০৬ সালের আইনে কর্মসংস্থান, মাতৃত্ব, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা, মজুরি, ক্ষতিপূরণ, ট্রেড ইউনিয়ন ও শ্রম বিরোধ নিষ্পত্তিসহ শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল। আর কত শ্রমিক পুড়লে–মরলে যথেষ্ট মনে হবে। অভ্যুত্থানের পরও গুলি করে শ্রমিক হত্যা কেন। একই বছর শ্রম আইনে বড় ধরনের সংশোধন এনে জরুরি বহির্গমন, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম, নিরাপত্তা কমিটি ও ট্রেড ইউনিয়ন–সংক্রান্ত নতুন বিধান যুক্ত করা হয়।

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি ও আন্তর্জাতিক চাপ

২০১৩ সালে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর শ্রমিকের নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তীব্র হয়। সাভারে ভবনধসে ১ হাজার ১৩৪ জন শ্রমিক নিহত এবং প্রায় ২ হাজার ৫০০ জন আহত হওয়ার ঘটনা বিশ্ববাজারের সামনে আমাদের শিল্প খাতকে এক বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। এর ফলে ২০১৮ সালেও আইনে আবার সংশোধন আনা হয়। তা সত্ত্বেও শ্রমিকের সংগঠিত হওয়ার অধিকার, শ্রম পরিদর্শন এবং সম্মিলিত দর-কষাকষি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র অসন্তোষ থেকে যায়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো শ্রমিক নেওয়া কমিয়ে দিলে আমাদের কী হবে।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালে কয়েকটি আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন আইএলওর সংবিধানের ২৬ অনুচ্ছেদের আওতায় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করে। এই অভিযোগের কেন্দ্রে ছিল শ্রম পরিদর্শন, সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা এবং ৮১, ৮৭ ও ৯৮ নম্বর কনভেনশনের সঠিক বাস্তবায়ন না হওয়া। ২০২৪ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত আইএলও গভর্নিং বডির ৩৫২তম অধিবেশনটি ছিল বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। সেখানে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে শ্রম আইন সংস্কারের রোডম্যাপ বাস্তবায়নে ইতিবাচক অঙ্গীকার প্রকাশ করা হয়। ওই আলোচনায় বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেন তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং তৎকালীন শ্রম উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। তখন আইএলও বাংলাদেশকে রোডম্যাপের অগ্রগতি দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানায়। ফলে বিষয়টির সঙ্গে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও রপ্তানি অর্থনীতির ভবিষ্যৎ সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়ে।

মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ও ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগ

পরবর্তী সময়ে ১২ নভেম্বর ২০২৪-এ আমাকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়, যার পাশাপাশি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও ছিল। তৎকালীন প্রেক্ষাপটে শ্রম আইন সংস্কারের দায়িত্ব নেওয়া ছিল চরম চ্যালেঞ্জিং। একদিকে আইএলওতে আর্টিকেল ২৬-এর অভিযোগ ঝুলছিল, অন্যদিকে মার্কিন ট্রেড বডি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকেও শ্রম অধিকার সংস্কারে তীব্র চাপ আসছিল। মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর তৎকালীন শ্রমসচিব মো. এহছান-ই-এলাহী, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং শ্রমিক-মালিক-সরকারের সমন্বয়ে গঠিত ত্রিপক্ষীয় পরামর্শক কমিটির (টিসিসি) মাধ্যমে দফায় দফায় বৈঠক শুরু হয়। খসড়া সংস্কারের একটি বহুল আলোচিত বিষয় ছিল বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা অন্যান্য জটিল প্রক্রিয়া সহজীকরণ। শ্রমবিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করা গেলে আদালতকেন্দ্রিক দীর্ঘ আইনি জটিলতা কমে আসে, তবে এর সাফল্য নির্ভর করে ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও বাস্তব প্রয়োগের ওপর।

দীর্ঘ আলোচনার পর ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এর একটি পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে খসড়ার গুরুত্বপূর্ণ রূপরেখা চূড়ান্ত হয়। এরপর ১০-২০ মার্চ ২০২৫ জেনেভায় অনুষ্ঠিত আইএলওর ৩৫৩তম গভর্নিং বডি অধিবেশনে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়ে আমি সেই খসড়ার মূল অগ্রগতি তুলে ধরি। এরপর দেশে ফিরে আবার একাধিক ত্রিপক্ষীয় বৈঠক, সেমিনার এবং ইইউ ও আইএলও প্রতিনিধিদের পরামর্শের মাধ্যমে খসড়াটিকে আরও পরিমার্জিত করা হয়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ৩৫৫তম গভর্নিং বডি অধিবেশনেও এই ধারাবাহিক অগ্রগতি তুলে ধরা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৭ নভেম্বর ২০২৫ জারি করা হয় বহুল প্রতীক্ষিত শ্রম অধ্যাদেশ। একই মাসে বাংলাদেশ আইএলওর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কনভেনশন—পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক ১৫৫ নম্বর কনভেনশন, স্বাস্থ্য উন্নয়ন কাঠামোসংক্রান্ত ১৮৭ নম্বর কনভেনশন এবং সহিংসতা ও হয়রানি প্রতিরোধসংক্রান্ত ১৯০ নম্বর কনভেনশন অনুসমর্থন করে।

আইএলও অধিবেশন ও ২০২৬ সালের অগ্রগতি

২০২৬ সালের মার্চে আইএলওর ৩৫৬তম অধিবেশনে বাংলাদেশের অগ্রগতি আবার পর্যালোচিত হয়। আইএলও এই ত্রিপক্ষীয় সংস্কারকে স্বাগত জানায়, তবে ইপিজেডসহ বাকি কাজ দ্রুত শেষ করার তাগিদ দিয়ে ২০২৭ সালের মার্চ অধিবেশনে পরবর্তী প্রতিবেদন জমার নির্দেশ দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের এপ্রিলেও শ্রম আইনে প্রয়োজনীয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়। এই সাম্প্রতিক সংস্কারগুলোর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য ও হয়রানি প্রতিরোধকে বাধ্যবাধকতা করা, ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের শর্ত সহজ করা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা বৃদ্ধি, চাকরিচ্যুতির পর শ্রমিককে অসৎ উদ্দেশ্যে কালোতালিকাভুক্ত করা বন্ধ করা এবং নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে শ্রমকল্যাণ নিশ্চিত করা। আইএলও সংস্কার রোডম্যাপের অগ্রগতি স্বীকার করলেও পরবর্তী অগ্রগতির সময়সীমা মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত নির্ধারণ করে দেয়।

বাস্তবায়নের মাঠে আসল পরীক্ষা

কিন্তু আইনি সংস্কার যত সুন্দরই হোক না কেন, আসল পরীক্ষা শুরু হয় বাস্তবায়নের মাঠে। আইনে ট্রেড Unions-এর অধিকার থাকা এক কথা, আর সেই অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে শ্রমিকের চাকরি না হারানো সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। বৈষম্য ও হয়রানি নিষিদ্ধ করা এক জিনিস, আর অভিযোগের পর নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত হওয়া অন্য জিনিস। কারণ, বৈশ্বিক বাজারে কেবল পণ্যের মান বা দাম যথেষ্ট নয়; পণ্যটি কতটুকু মানবিক ও নিরাপদ পরিবেশে তৈরি হয়েছে, তা–ও এখন রপ্তানির প্রধান শর্ত।

২০০৬ থেকে ২০২৬—এই দুই দশকের ইতিহাস দেখায় যে শুধু নতুন আইন বা অধ্যাদেশ যুক্ত করলেই মৌলিক সমস্যার সমাধান হয় না। আইএলও ২০২৭ সালের মার্চে বাংলাদেশের অগ্রগতি আবার পর্যালোচনা করবে। তার আগে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে কারখানাগুলোতে শ্রমিকেরা কি আসলেই ইউনিয়ন করার স্বাধীনতা পাচ্ছেন? হয়রানির অভিযোগ জানালে নিরপেক্ষ বিচার পাচ্ছেন? এই প্রশ্নগুলোর ইতিবাচক উত্তর পাওয়া গেলেই কেবল বলা যাবে ২০২৬ সালের শ্রম আইন সংস্কার সফল হয়েছে এবং তা শুধু কাগজেই সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবে রূপ নিয়েছে।