ইউক্রেনের দক্ষিণ অঞ্চলের খেরসন প্রদেশের ওলেশকি শহর এখন তীব্র খাদ্য ও মানবিক সংকটের মুখে। রাশিয়ার দখলে থাকা এই শহরটিতে খাবার, বিশুদ্ধ পানি, বিদ্যুৎ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবার সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। যুদ্ধের আগে প্রায় ২৪ হাজার মানুষের প্রাণচঞ্চল এই শহরে এখন মাত্র দুই হাজার বেসামরিক মানুষ টিকে থাকার সংগ্রাম করছেন, যার মধ্যে প্রায় ৫০টি শিশু রয়েছে বলে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের তথ্যে জানা গেছে। বর্তমানে সেখানে প্রায় ২ হাজার বেসামরিক মানুষ রয়েছেন। যুদ্ধের কারণে তার নিজের বাড়ি ও যেখানে গত শীতে আশ্রয় নিয়েছিলেন সেই বাড়িটিও ধ্বংস হয়েছে। শহরে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও কেন্দ্রীয় পানির সরবরাহও নেই।
খাদ্য সংকটের ভয়াবহতা এতটাই যে, স্থানীয় বাসিন্দারা বাগানে জন্মানো ঘাস ও আগাছা রান্না করে ক্ষুধা মেটানোর চেষ্টা করছেন। এক স্থানীয় নারী জানান, পুষ্টিকর খাবারের অভাবে তার শারীরিক ওজন ১১০ কেজি থেকে কমে ৬৭ কেজিতে নেমে এসেছে। নিয়মিত খাবার না পাওয়া তার জন্য বেঁচে থাকার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপে কোন ধরনের আগাছা খাওয়া নিরাপদ এবং কীভাবে সেগুলো রান্না করতে হয়, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে আগ্রাসন শুরুর পর থেকে ডিনিপ্রো নদীর পূর্ব তীরের এই শহরটি রুশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ২০২৩ সালে কাখোভকা বাঁধ ধ্বংসের ফলে সৃষ্ট বন্যায় শহরের অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার প্রভাব এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে শহরটি ইউক্রেনীয় ও রুশ বাহিনীর মধ্যবর্তী একটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। বাসিন্দাদের মতে, গত মে মাস থেকে শহরে খাদ্য সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এরপর দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায় এবং বাসিন্দাদের হাতে থাকা খাদ্যও ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যায়। এরপর থেকে শহরের স্বাভাবিক জীবন আর ফিরতে পারেনি।
শহরের বাইরের পরিস্থিতির চিত্রও অত্যন্ত উদ্বেগজনক। খাবারের খোঁজে বাইরে যাওয়া বাসিন্দাদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে মাইন এবং ড্রোন হামলা। গত ২০ সেপ্টেম্বর ২৩ কিলোমিটার দূরের রাদেনস্ক এলাকায় খাবার আনতে গিয়ে এক দম্পতি কারফিউয়ের মধ্যে আটকে পড়ে ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন। নিরাপত্তার ঝুঁকি ও রাস্তার মাইনের কারণে বাসিন্দারা শহর থেকে বের হওয়ার সাহস পাচ্ছেন না।
নিহত ব্যক্তিদের দাফন নিয়েও দেখা দিয়েছে বড় সংকট। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ ও সম্পদের অভাবে অনেক মরদেহ দিনের পর দিন হাসপাতালের মর্গে পড়ে থাকছে অথবা রাস্তায় অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। যদিও এসব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন, তবে স্থানীয়রা বিভিন্ন ছবি ও তথ্যের মাধ্যমে ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন। জাতিসংঘের ইউক্রেন মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ মিশনের তথ্যমতে, চলতি বছর ওলেশকি ও এর আশেপাশের হোলা প্রিস্তান এলাকায় অন্তত ২৯ জন নিহত ও ৫৪ জন আহত হয়েছেন। তারা স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে এ বিষয়ে একাধিক ছবি পেয়েছে।
এই মানবিক সংকট নিয়ে ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা গত ২৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জরুরি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি জানান, শহরের শিশুরা ও সাধারণ মানুষ ঘাস খেয়ে বেঁচে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। সিবিহা জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক রেডক্রসসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে দ্রুত মানবিক সহায়তার করিডোর তৈরি এবং নাগরিকদের নিরাপদে বের করে আনার ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।
তবে এই সংকটের জন্য দুই পক্ষ একে অপরকে দায়ী করছে। ইউক্রেন রাশিয়ার দখলকে দায়ী করছে, অন্যদিকে রুশ মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ ২১ সেপ্টেম্বর পরিস্থিতিকে সংকটজনক স্বীকার করলেও ইউক্রেনীয় হামলাকে এর জন্য দায়ী করেছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় রুশ সেনারা কাজ করছে বলে দাবি করেছে ক্রেমলিন।
এদিকে পরিস্থিতির উন্নয়নে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ বড় ড্রোনের মাধ্যমে জরুরি সাহায্য পাঠানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় চার টন খাদ্যসামগ্রী ও জরুরি উপকরণ ১০০টি নির্ধারিত স্থানে ফেলার কথা জানিয়েছে খেরসন আঞ্চলিক সামরিক প্রশাসন। যদিও এই সহায়তার কতটুকু মানুষের কাছে পৌঁছেছে, তা নিশ্চিত নয়।
ইউরোপ কাউন্সিলের মানবাধিকার কমিশনার মাইকেল ও’ফ্লাহার্টিও ২৫ সেপ্টেম্বর ওলেশকির পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি অবিলম্বে মানবিক সহায়তার সুযোগ প্রদান এবং বেসামরিকদের নিরাপদ প্রস্থানের পথ নিশ্চিত করতে আহ্বান জানিয়েছেন। যুদ্ধের ভয়াবহতা, দখলদারিত্ব এবং চরম খাদ্যসংকটে বর্তমানে ওলেশকি বিশ্বের অন্যতম বড় মানবিক বিপর্যয়কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।