প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য আর ঐতিহ্যের লীলাভূমি বাংলাদেশ। বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন সমুদ্রসৈকত, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন, পাহাড়, নদী ও প্রত্নসম্পদ—পর্যটনের সব রসদই এখানে বিদ্যমান। তবে এত সম্ভাবনা সত্ত্বেও খাতটি নিয়ে যে বড় স্বপ্ন দেখা হচ্ছে, তা বাস্তবায়নে নানামুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সরকারি তথ্যমতে, পর্যটন খাতের অবদান জিডিপির ২ থেকে ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬ থেকে ৭ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সমুদ্র, পাহাড়, বন, নদী, দ্বীপ, প্রত্নসম্পদ আর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি— পর্যটনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব উপাদানই আছে বাংলাদেশে। বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন সমুদ্রসৈকত, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়, সিলেটের চা-বাগান, নদীমাতৃক ভূপ্রকৃতি, পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, ষাটগম্বুজ মসজিদ ও মহাস্থানগড়ের মতো ঐতিহাসিক নিদর্শন দেশের পর্যটন সম্ভাবনাকে করেছে অনন্য। কিন্তু এ বিপুল সম্পদের তুলনায় জাতীয় অর্থনীতিতে পর্যটনের অবদান এখনো সীমিত।

এই লক্ষ্য অর্জনে পর্যটন খাতের মাস্টারপ্ল্যান হালনাগাদ করার কাজ চলছে, যা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন হবে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন সচিব ফাহমিদা আখতার শনিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পর্যটন ভবনে বিশ্ব পর্যটন দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান। তিনি বলেন, পর্যটন খাতের প্রকৃত চিত্র জানতে যে তথ্য-উপাত্তের ঘাটতি রয়েছে, তা পূরণে কাজ করছে সরকার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) আওতায় ‘ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট’ তৈরির কার্যক্রম চলমান আছে। এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান, পর্যটকের সংখ্যা এবং জিডিপিতে এ খাতের প্রকৃত অবদানের চিত্র স্পষ্ট হবে, যা ভবিষ্যতে পর্যটকদের আগ্রহের জায়গাগুলো উন্নয়নে সহায়তা করবে। সরকারের নীতিনির্ধারণী নির্দেশনা ও পাঁচ বছরের কৌশলগত উন্নয়ন পরিকল্পনার আলোকে পর্যটন মাস্টারপ্ল্যান সংশোধন ও হালনাগাদ করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে কোনো সংশয় না থাকলেও পরিকল্পিত ব্যবহারের অভাব প্রকট। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পর্যটন ব্র্যান্ডিং ও বিপণন ব্যবস্থা যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। দীর্ঘমেয়াদি প্রচারণার ঘাটতি থাকায় গন্তব্যগুলোকে আলাদা পণ্য হিসেবে তুলে ধরা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া, কক্সবাজার, সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো পর্যটন এলাকায় বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়লেও অনুকূল পরিবেশের অভাব ব্যবসায়ীদের জন্য একটি বড় অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। মাস্টারপ্ল্যানের আলোকে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি নেওয়া হবে। সম্ভাবনার সঙ্গে ব্যবধান: বিশেষজ্ঞ ও খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন নেই; প্রশ্ন হলো সেই সম্ভাবনাকে কতটা পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে।

প্যাসিফিক এশিয়া ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশন (পাটা) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের মহাসচিব এবং জ্যেষ্ঠ পর্যটন বিশেষজ্ঞ তৌফিক রহমান জানান, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মূল লক্ষ্যপূরণে বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে প্রধান বাধা বিভিন্ন দেশের ভ্রমণ সতর্কবার্তা বা ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি। অনেক দেশ বাংলাদেশকে ‘রেড মার্ক’ বা উচ্চ সতর্কতাপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করে রেখেছে, যা পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন তিনি। সচিবের মতে, ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি সংশ্লিষ্ট দেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত হলেও, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতির টেকসই উন্নয়ন ও কার্যকর কূটনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে এ অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব।

নিরাপত্তা জোরদারে ট্যুরিস্ট পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রধান পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে বিদেশি পর্যটকদের চলাচলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। পর্যটনসেবাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে ৯৯৯ এর পাশাপাশি বিশেষায়িত হেল্পলাইনকে আরও কার্যকর করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, ‘নিরাপদ বাংলাদেশ’ বার্তাটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্র্যান্ডিং করার জন্য শীর্ষস্থানীয় ট্রাভেল ব্লগার ও ইনফ্লুয়েন্সারদের আমন্ত্রণ জানানোর পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ওয়েসিস কনসোর্টিয়ামের প্রধান নির্বাহী জুয়েল খান মনে করেন, শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, দক্ষ জনবল, উন্নত সার্ভিস কালচার ও পর্যটনকেন্দ্রিক সেবা নিশ্চিত করাই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার চাবিকাঠি। পর্যটন খাতের প্রসারে ‘ইকো-ট্যুরিজম’, ‘কালচারাল ট্যুরিজম’ ও ‘অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম’-কে প্রাধান্য দিয়ে সমন্বিত ব্র্যান্ডিংয়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। পর্যটন সুফল যেন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায়, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞদের দাবির মধ্যে রয়েছে পর্যটন খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো, কক্সবাজার বিমানবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক মানে কার্যকর করা, পর্যটন পুলিশের কাভারেজ বৃদ্ধি এবং ই-ভিসা সুবিধার আওতা বাড়ানো। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের হোটেল ও রেস্তোরাঁয় করছাড় ও বিশেষ প্রণোদনা প্রদানের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

এদিকে, বর্তমান বিশ্ব পর্যটন দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— ‘ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন’। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের মাধ্যমে গন্তব্যের ভার্চুয়াল অভিজ্ঞতা ও তথ্যসেবা সহজ করার বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। পর্যটন খাতের উৎকর্ষ ও উদ্ভাবনকে স্বীকৃতি দিতে এবার প্রথমবারের মতো ‘বাংলাদেশ পর্যটন পুরস্কার ২০২৬’ দেওয়া হচ্ছে। ১৩টি ভিন্ন ক্যাটাগরিতে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদের এই সম্মাননা প্রদান করা হবে, যা পর্যটন শিল্পে নতুন গতি সঞ্চার করবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এবার সেই সম্ভাবনাকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে বড় পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার।