সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের দিকে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি সশস্ত্র গোষ্ঠীর ছোড়া দুটি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে দেশটির নেতৃত্বাধীন জোট। একই সঙ্গে দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর খামিস মুশাইতের দিকে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শনাক্ত ও ধ্বংস করেছে বলে জানিয়েছেন জোটের মুখপাত্র। শহরটিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটি রয়েছে।

হামলার প্রেক্ষাপট ও নিন্দা

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র জানিয়েছেন, ‘সন্ত্রাসী হুতি মিলিশিয়া’ পরিকল্পিতভাবে রিয়াদ ও খামিস মুশাইতকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল। এর আগে গত বৃহস্পতিবারও হুতিরা সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছিল, যার মধ্যে ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথেই ধ্বংস করার কথা জানায় সৌদি কর্তৃপক্ষ। এই ধারাবাহিক হামলার পরিপ্রেক্ষিতে মক্কা, জেদ্দা ও প্রধান তেল বন্দর ইয়ানবুসহ বিভিন্ন এলাকায় জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এসব হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ বলেছে, এই আগ্রাসনে নারী ও শিশুসহ বহু বেসামরিক মানুষ আহত হয়েছেন। এ ছাড়া ট্যাংকারে হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া এবং এসব তৎপরতার কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

মিত্রদের সামরিক সহায়তা ও কৌশল

হুতিদের ক্রমবর্ধমান হামলা মোকাবিলায় সৌদি আরবের পাশে দাঁড়িয়েছে মিত্রদেশগুলো। ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’র আওতায় রিয়াদকে কীভাবে সামরিক সহায়তা প্রদান করা যায়, তা নিয়ে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সেনাপ্রধানেরা একটি জরুরি বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন। এই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, সদস্য দেশগুলোর যেকোনো একটির ওপর আক্রমণ সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য হবে। মাঠপর্যায়ের কৌশল চূড়ান্ত করতে তুরস্কের সেনাপ্রধান জেনারেল সেলসুক বায়রাকতারোগলু এরই মধ্যে সৌদি আরব সফর করেছেন। তবে তুরস্কের পার্লামেন্টে চুক্তিটি এখনো অনুমোদন না পাওয়ায় আঙ্কারার সহায়তা আপাতত দ্বিপক্ষীয় ও কারিগরি সহায়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গত আগস্টে স্বাক্ষরিত চুক্তির ভিত্তিতে ইতিমধ্যে নিউইয়র্কে বৈঠক করেছেন সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। সেখানেই তিন দেশের সেনাপ্রধানেরা আলোচনায় বসার কথা।

অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও লোহিত সাগরের পরিস্থিতি

লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ তেল বন্দর ইয়ানবু রক্ষায় সেনা ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। তিনি জানিয়েছেন, বন্দরটির সুরক্ষায় সেনাসদস্য, রাডার ও আধুনিক ব্যবস্থা পাঠানো হলেও এই উপস্থিতির উদ্দেশ্য সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো নয়। এদিকে হুতি রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য হেজাম আল-আসাদ দাবি করেছেন, তাদের সশস্ত্র বাহিনী এটিকে পূর্ণ মাত্রার যুদ্ধের প্রস্তুতির চেয়ে বরং ছোট পরিসরের মহড়া হিসেবে দেখছে। জুলাই মাসে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাত অঞ্চলটিতে নতুন করে মানবিক সংকটের ঝুঁকি তৈরি করেছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, গত আগস্ট থেকে ইয়েমেনে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যার মধ্যে ৭০ হাজারই শিশু। হুতিরা লোহিত সাগরের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে রাখার ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও অস্থিরতা বিরাজ করছে। জুলাইয়ে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাত কয়েক বছর ধরে চলা যুদ্ধবিরতি ভেঙে দেয়। এদিকে হুতি বাহিনী ইয়েমেনি বাহিনীর বিরুদ্ধে যে স্থল অভিযান চালাচ্ছে, তাতে দেশটিতে নতুন করে মানবিক সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে দেওয়া এক দীর্ঘ টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

নিরাপত্তা পরিষদের অবস্থান

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পর্যায়ক্রমিক সভাপতি ও জাতিসংঘে নিযুক্ত ফ্রান্সের দূত জেরোম বনফোঁ জানিয়েছেন, নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুতিদের অব্যাহত হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। বেসামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোয় এই আঘাত আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। ইয়েমেন থেকে হুতিদের নির্মূল না করা পর্যন্ত সেনাদের লড়াই চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি। সব মিলিয়ে, এই সংঘাত ইয়েমেনকে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনে জড়িয়ে ফেলেছে।