জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ভাষণে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা, রোহিঙ্গা সংকট ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ও জাতীয় বিষয় তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার (২৫ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত ৪টা ১৮ মিনিটের দিকে তিনি বাংলায় এই ভাষণ প্রদান করেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে এটি তার প্রথম ভাষণ। এই ভাষণের মাধ্যমে পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণের এক নতুন ইতিহাস গড়লেন তারেক রহমান। এর আগে ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট তার পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১১তম বিশেষ অধিবেশনে এবং ১৩ বছর পর ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর তার মা ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ৪৮তম অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছিলেন।
ভাষণের মূল অংশ ও প্রেক্ষাপট
মাননীয় সভাপতি, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায় আপনাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় আমরা আপনাকে পূর্ণ সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। একইসঙ্গে আমি বিদায়ী সভাপতি ম্যাডাম এনালেনা বেয়ারবক-কেও তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বের জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বীর ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানে সকল শহীদ এবং আহতদের প্রতিও আমি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা জানাই। এই বাংলাদেশে চলতি বছরের ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনে জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। মাননীয় সভাপতি, জাতিসংঘের এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে এই মুহূর্তে আজ আমি কিছুটা স্মৃতিকাতর। এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়েই আমার পিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বার্তা দিয়েছিলেন। আজ আমি দাঁড়িয়েছি এক নতুন বাংলাদেশ নিয়ে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং সোশ্যাল মিডিয়ার বিকাশ ও দ্রুত সম্প্রসারণের সুফল যাতে দেশে দেশে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো যায়, এ ব্যাপারে জাতিসংঘের একটি কার্যকর নীতিমালা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। মাননীয় সভাপতি, বাংলাদেশ ‘স্বল্পোন্নত দেশ’-এর তালিকা থেকে উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে। রাষ্ট্রের নাগরিকদের ক্ষমতাহীন রেখে রাষ্ট্র কখনো শক্তিশালী হতে পারে না। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহিতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগ পরিবেশ সবক্ষেত্রেই বাংলাদেশে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রয়েছে। এজন্যই আমরা বলি ‘সবার আগে বাংলাদেশ: সবার জন্য বাংলাদেশ’।
বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা
মাননীয় সভাপতি, চলমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্য- ‘রিস্টোরিং ট্রাস্ট, ম্যানেজিং ট্রান্সফরমেশন: এ ইউনাইটেড নেশসনস দ্যাট ডেলিভারস ফর অল’ অত্যন্ত সময়োপযোগী। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের নারীদের সাহসী অংশগ্রহণ ‘নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা’ বিষয়ক কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। অভিবাসন প্রক্রিয়া মানবসভ্যতার মতোই প্রাচীন। বিশ্বের অনেক দেশেই অভিবাসীগণ তাদের জন্মভূমি এবং অভিবাসিত দেশ, উভয় দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। অভিবাসীদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আরও জোরালো বৈশ্বিক সহযোগিতা আশা করে। মাননীয় সভাপতি, বাংলাদেশকে দীর্ঘ নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে হচ্ছে। এর ফলে আমাদের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। জনবহুল বাংলাদেশ মনে করে, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও সমাধান উভয়ই মিয়ানমারের অভ্যন্তরে নিহিত। এই সংকটের চূড়ান্ত সমাধানের জন্য বাংলাদেশ জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় এবং কার্যকর সমর্থন প্রত্যাশা করে। পাশাপাশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের জীবন রক্ষাকারী সহায়তা কর্মসূচি অব্যাহত রাখার আহ্বান জানাই। মাননীয় সভাপতি, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান নগণ্য হলেও, এর বিরূপ প্রভাব আমরা নিয়মিত ভোগ করছি। বাংলাদেশে পরিবেশ সুরক্ষায় সরকার কর্মসূচি জোরদার করেছে। এরই অংশ হিসেবে সরকার আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি শুরু করেছে। বাংলাদেশে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনে মিঠা পানির প্রবাহ বৃদ্ধি এবং বৃহৎ জলাধারের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণের জন্য তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। মাননীয় সভাপতি, দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের অবসান ঘটিয়ে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদ মুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশের সামনে বর্তমানে এক অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগে বর্তমানে বাংলাদেশে কর্মক্ষম জনশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী। তাই আর্থ-সামাজিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে নারীরা আমাদের পরিকল্পনার অগ্রভাগে রয়েছেন। প্রতিটি পরিবারের নারী প্রধানের নামে ইস্যু করা ‘ফ্যামিলি কার্ড’কে সরকার নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করে। প্রতিটি সেক্টরে সহায়তার জন্য প্রবর্তন করা কার্ডগুলোকে সমন্বয় করে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালু করাও সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে। মাননীয় সভাপতি, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে দেওয়া ৩১ দফা কর্মসূচি সরকার বাস্তবায়ন করে চলেছে। সরকার আশা করে, এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে শহর এবং গ্রামের মধ্যে উন্নয়ন বৈষম্য দূর হবে এবং একইসঙ্গে ২০৩০ এজেন্ডার সব ক্ষেত্রে লক্ষ্য অর্জিত হবে। পরিশেষে, মাননীয় সভাপতি আপনাকে ধন্যবাদ, আল্লাহ হাফেজ, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রধানমন্ত্রীর পুরো ভাষণটি নিচে তুলে ধরা হলো। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: স্বাধীনতার পর থেকে দেশে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা আত্মত্যাগ করেছেন তাদের অবদানকে বিনম্রচিত্তে স্মরণ করছি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একইভাবে আজ আমিও আমার দেশ এবং জনগণের স্বার্থের পক্ষে এবং একটি শান্তিময় বিশ্ব সমাজের প্রত্যাশায় এখানে দাঁড়িয়েছি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বহুপাক্ষিকতার নীতিতে অটল। ‘পিসবিল্ডিং কমিশনে’র ভাইস-চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশ টেকসই শান্তি, সংঘাত প্রতিরোধ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শান্তি প্রতিষ্ঠার পক্ষে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্যর্থ হলে অদূর ভবিষ্যতে এটি এক মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এমতাবস্থায়, বাংলাদেশ ঝুঁকি মোকাবেলা করে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জনের পথ বেছে নিয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সুতরাং, ক্লাইমেট জাস্টিস, জলবায়ু অর্থায়ন এবং অভিযোজন সহায়তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কপ-৩১ এ আরও জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপ আশা করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ক্লিন এনার্জি এবং সোলার এনার্জি ব্যাবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।