জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে জর্ডান, তুরস্ক ও কাতারের নেতারা ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করেছেন। জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ ইসরায়েল সরকারের সম্প্রসারণবাদী নীতিকে ‘আঞ্চলিক হুমকি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোয়ান গাজা ও মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের কার্যকলাপ বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জোরালো চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিকে ইতিহাসের অন্যতম বিপজ্জনক পর্যায় হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে বাদশাহ আবদুল্লাহ বলেন, ইসরায়েল সরকারের সম্প্রসারণবাদী আকাঙ্ক্ষা এখন আঞ্চলিক হুমকিতে পরিণত হয়েছে। তিনি বিশেষ করে দক্ষিণ সিরিয়ার পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ইসরায়েল বারবার সীমান্ত অতিক্রম করছে, ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ বাড়াচ্ছে এবং মাটিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। তার মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রতিবার চোখ ফিরিয়ে নিলে ইসরায়েল আরও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

জর্ডানের বাদশাহ আরও বলেন, তার দেশের জন্য উত্তর সীমান্তের নিরাপত্তা এবং পানি নিরাপত্তার ওপর যেকোনো হুমকি জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, দক্ষিণ সিরিয়ায় ইসরায়েলের বর্তমান নীতি অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তা নিষ্ক্রিয়ভাবে মেনে নেবে কি না। একই সঙ্গে তিনি ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার, ইউএনআরডব্লিউএ এবং জেরুজালেমের মুসলিম ও খ্রিস্টান পবিত্র স্থানগুলোর ঐতিহাসিক ও আইনগত মর্যাদা রক্ষায় জর্ডানের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানও জাতিসংঘের অধিবেশনের পার্শ্ববর্তী সময়ে কাতারের আমির শেখ তামিমের সঙ্গে বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। তুরস্কের প্রেসিডেন্টের যোগাযোগ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় শান্তির পথে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের অনীহা নিয়ে এরদোয়ান উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি মন্তব্য করেন, ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জোরালো চাপ প্রয়োজন।

এরদোয়ান ও শেখ তামিমের বৈঠকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন বিষয় ছাড়াও দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়। বিনিয়োগ, বাণিজ্য, জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও তারা আলোচনা করেন। আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহে যে সমস্যা তৈরি হচ্ছে, তা মোকাবিলায় জ্বালানি ও পরিবহন করিডর নিয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এর আগে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিকে ইতিহাসের অন্যতম বিপজ্জনক পর্যায় হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সংকট সমাধান পিছিয়ে দেওয়া এবং অস্থায়ী নীতির কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। তার মতে, বিরোধ নিষ্পত্তিতে সংলাপ, আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের অধিকারের প্রতি সম্মানকে গুরুত্ব দিতে হবে। কাতারের আমির মধ্যপ্রাচ্যে একটি আঞ্চলিক সম্মিলিত নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন। তার মতে, এ ধরনের ব্যবস্থায় রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান এবং বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে।

গাজা নিয়েও তিন দেশের নেতাদের বক্তব্যে উদ্বেগ উঠে আসে। ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে কাতার, জর্ডান, তুরস্কসহ আটটি আরব ও মুসলিম দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠক করে গাজার মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা গাজায় মানবিক সহায়তা দ্রুত ও নিরাপদভাবে পৌঁছানো এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পুনর্বাসনের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকার এবং একটি ন্যায়সংগত ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

জাতিসংঘের এবারের অধিবেশনে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট অন্যতম প্রধান আলোচ্য হয়ে উঠেছে। ইরান যুদ্ধ, গাজা, পশ্চিম তীর, সিরিয়া এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন দেশের নেতারা বক্তব্য দিচ্ছেন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন।