মার্কিন বাণিজ্য ঘাটতি দূর করা ও দেশীয় শিল্প সুরক্ষার লক্ষ্যে শতাধিক দেশের ওপর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত নতুন প্রতিশোধমূলক শুল্ক আরোপ করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ পদক্ষেপের ফলে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক নির্ধারিত হয়েছে, যেখানে এতদিন গড়ে ১৫ শতাংশ হারে শুল্ক দিতে হতো। বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করা এই সিদ্ধান্ত প্রকাশের পর বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বাণিজ্য সম্পর্ক এবং ঘাটতির বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার।
দুই দেশের বাণিজ্যে বাংলাদেশের পাল্লা ভারী। বাংলাদেশে মার্কিন আমদানির তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানি অনেক বেশি। দেশের রপ্তানি আয় মূলত মৌলিক তৈরি পোশাক পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রধানত পাঁচটি পণ্য আমদানি করে—যার মধ্যে লোহা, ইস্পাত, খনিজ জ্বালানি, তুলা, তেলবীজ ও নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টর উল্লেখযোগ্য। আমি যখন প্রেসিডেন্ট ছিলাম তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলার ফিউমেগেশন সহজতর করে দিয়েছি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দুই দেশের মধ্যে মোট ১০ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৭ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার এবং আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে আমদানি হয়েছিল ২ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। যদিও চীন, ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো বড় অর্থনীতির তুলনায় দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ খুব বেশি নয়, তবে বাংলাদেশের জন্য এটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
বিগত বছরগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশে রপ্তানি করেছিল ৯৭০১ দশমিক ৩৪ মিলিয়ন ডলারের পণ্য এবং আমদানি করে ২৩৪৪ দশমিক ২৬ মিলিয়ন ডলার। ২০২১-২২ অর্থবছরে রপ্তানি ছিল ১০৪১৭ দশমিক ৭২ মিলিয়ন ডলার ও আমদানি ২৮২৫ দশমিক ৭৪ মিলিয়ন ডলার। এছাড়া ২০২০-২১ অর্থবছরে ৬৯৭৪ দশমিক ০১ মিলিয়ন ডলার রপ্তানির বিপরীতে আমদানি ছিল ২২৬৮ দশমিক ২০ মিলিয়ন ডলার; ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৫৮৩২ দশমিক ৩০ মিলিয়ন ডলার রপ্তানির বিপরীতে আমদানি ছিল ২১২৬ দশমিক ১০ মিলিয়ন ডলার; ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৬৮৭৬ দশমিক ২৯ মিলিয়ন ডলার রপ্তানির বিপরীতে আমদানি ১৭৭৩ দশমিক ৫০ মিলিয়ন ডলার এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৫৯৮৩ দশমিক ৩১ মিলিয়ন ডলার রপ্তানির বিপরীতে আমেরিকা থেকে পণ্য আমদানি হয়েছিল ১৭০৪ দশমিক ৬৬ মিলিয়ন ডলারের।
সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৬০১ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলারের লোহা ও ইস্পাত, ৫৯৫ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলারের খনিজ জ্বালানি, ৩৬১ মিলিয়ন ডলারের তুলা, ৩৪১ মিলিয়ন ডলারের তেলবীজ এবং ১১১ মিলিয়ন ডলার মূল্যের নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টর আমদানি করে। বিপরীতে একই অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট ৭ দশমিক ৫ ৯ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয়ের মধ্যে ৭ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলারই এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। অবশিষ্ট আয় এসেছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, জুতা, ওষুধ এবং বিভিন্ন কৃষিভিত্তিক পণ্য থেকে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে শুল্কের যৌক্তিকীকরণ ও বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বিকল্প আমদানির উৎস খোঁজার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, মার্কিন সরকার নিজেরাও শুল্ক হার হ্রাস দেখতে চায়, যেখানে তারা বর্তমানে ৭৪ শতাংশ কর দিচ্ছে। এই শুল্কের পরিমাণ ৪০ শতাংশে নামিয়ে আনতে পারলে তা আমাদের রপ্তানিকারকদের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করা হলে বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়বে এবং বৈষম্য কমবে। ওয়াশিংটন শুল্ক ছাড়ের আহ্বানে সাড়া দিলে বাংলাদেশকে নীতিগত সংস্কারে মনোযোগ দিতে হবে, যা পরবর্তীতে মার্কিন ব্যবসায়ীদের সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। আমি মনে করি, এটা ৪০ শতাংশে নামিয়ে আনলে তা আমাদের রপ্তানিকারকদের জন্য ইতিবাচক হতে পারে।’।
বাণিজ্য ভারসাম্য তৈরিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানির সুযোগ বাড়ানোর কথা বলেছেন তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ফারুক হাসান। তিনি জানান, তার মেয়াদে মার্কিন তুলা আমদানির ক্ষেত্রে ফিউমিগেশন প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছিল, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি সহজ হয় এবং এর পরিমাণও বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশ সরকার যদি মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করে, তবে আমেরিকা থেকে আরও বেশি তুলা ও সম্পর্কিত কাঁচামাল আমদানি সম্ভব হবে, যা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা মার্কিন বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্যায়ন এবং নতুন ব্যবসায়িক ক্ষেত্র তৈরি করতে যৌথ বাণিজ্য মেলার আয়োজনের ওপর জোর দেন। বাড়তি এ শুল্ক আরোপের ঘোষণার পর ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণের চেষ্টা। এই শুল্ক থেকে মুক্তি, বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, ব্যবসায়িক ক্ষতি থেকে পরিত্রাণের উপায় প্রভৃতি বিষয় রয়েছে আলোচনায়।