ইরান-সমর্থিত একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাম্প্রতিক হামলার জেরে সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার সৌদি কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তার স্বার্থে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে এই পাইপলাইনটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। প্রায় ৭৫০ মাইল দীর্ঘ এই গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইনটি সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল থেকে অপরিশোধিত তেল দেশটির পশ্চিম উপকূলে পৌঁছে দেয়। ফেব্রুয়ারিতে ইরানের সঙ্গে সংঘাত শুরুর পর এটিই ছিল দেশটির তেল রপ্তানির প্রধান ও সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ। পাইপলাইনটি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বিশ্ববাজারে প্রায় ৪ শতাংশ তেল সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে, যা জ্বালানির বৈশ্বিক দামকে আরও উস্কে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার বর্তমান পরিস্থিতিতে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন প্রতি সপ্তাহ বন্ধ থাকলে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অন্তত শূন্য দশমিক ২ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক তা বোঝা যায় কেপলারের তথ্যে; তাদের হিসাবে, পাইপলাইনটি এক মাস বন্ধ থাকলে বিশ্ববাজারে প্রায় ১২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। ইতিমধ্যে গোল্ডম্যান স্যাকস সতর্কতা জারি করেছে যে, পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগরে চলমান হামলা অব্যাহত থাকলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। উল্লেখ্য, বুধবার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০৭ ডলারে লেনদেন হচ্ছিল, যা সংঘাত শুরুর আগের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি।

কেপলারের মধ্যপ্রাচ্য ও ওপেক প্লাসবিষয়ক বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান আমেনা বকর বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘ভয়াবহ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি জানান, দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বাধা, ধারাবাহিক হামলা এবং ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতার কারণে জ্বালানি নিরাপত্তা চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। এদিকে নিউ ইয়র্ক টাইমসের পর্যালোচনা করা ১০ ও ১১ সেপ্টেম্বরের উপগ্রহচিত্রে পাইপলাইনের দুটি পাম্পিং স্টেশনে ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন স্পষ্ট হয়েছে। যদিও সৌদি সরকার বা রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি সৌদি আরামকো আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষতির পরিমাণ কিংবা পাইপলাইন চালুর সময়সীমা নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে আমেনা বকরের ধারণা, পাইপলাইনটি পুরোপুরি মেরামত করতে পাঁচ থেকে ছয় সপ্তাহ প্রয়োজন হতে পারে, যদিও আংশিক মেরামত এর চেয়ে দ্রুত সম্ভব।

অতীতে এ ধরনের হামলার পর দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক করার নজিরও রয়েছে। ২০১৯ সালে হুথিদের বড় হামলার পর কয়েক দিনের মধ্যেই তেল সরবরাহ চালু হয়েছিল এবং চলতি বছরের এপ্রিলে একটি পাম্পিং স্টেশনে হামলার পর মাত্র সাত দিনে পূর্ণ সক্ষমতা ফিরে এসেছিল। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো রবিন ব্রুকস এবং যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইটও মনে করেন, এটি একটি ‘স্বল্পমেয়াদী ও সাময়িক’ বাধা। রাইটের মতে, দ্রুতই সরবরাহ আবার শুরু হওয়া সম্ভব। তবে বর্তমান অস্থিরতায় বিকল্প সরবরাহের পথও সংকুচিত হয়ে এসেছে। সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দরে ২ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল তেল মজুতের সক্ষমতা থাকলেও রিস্ট্যাড এনার্জির হিসাবে, সেই মজুত দিয়ে মাত্র তিন থেকে ছয় দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব।

ইরানের সঙ্গে সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ায় এই ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনই সৌদি আরবের প্রধান ভরসা ছিল। এটি হরমুজ এড়িয়ে তেল লোহিত সাগরে নেওয়ার সুযোগ দেয়, যেখান থেকে বাব আল-মান্দাব প্রণালি কিংবা মিসরের সুয়েজ খাল হয়ে তেল পাঠানো হয়। কিন্তু বাব আল-মান্দাব প্রণালির বড় অংশ হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় সৌদি জাহাজগুলো আবারও হরমুজমুখী হতে বাধ্য হচ্ছে। কেপলারের তথ্য বলছে, ৭ সেপ্টেম্বরের পর লোহিত সাগর দিয়ে মাত্র দুটি সৌদি জাহাজ চলাচল করেছে। যেখানে সংঘাতের আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করত, সেখানে গত এক সপ্তাহে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ২০-এ। যদিও জুন মাসে আরামকোর চেয়ারম্যান ইয়াসির ও. আল-রুমাইয়ান জানিয়েছিলেন, পাইপলাইনের সক্ষমতা বাড়িয়ে দৈনিক ৭০ লাখ ব্যারেল করা হয়েছে—যা সংঘাতপূর্ব সক্ষমতার চেয়ে ৩০ শতাংশ বেশি। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ওমানের উপকূল দিয়ে কিছু তেল সরবরাহ চালু রাখার চেষ্টা করছে, তবে এই পথ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং ব্যাপক সামরিক নিরাপত্তা প্রয়োজন হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পাইপলাইনে ক্ষতির মাত্রা এবং মেরামতের সময়ের ওপর সরবরাহ ঘাটতির পরিমাণ নির্ভর করবে।