শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কালজয়ী চরিত্র দেবদাসকে আমরা সাধারণত প্রেমে ব্যর্থ হয়ে মদে ডুবে আত্মহননের পথে যেতে দেখেছি। বাংলা সাহিত্যে দেবদাস এক বিরহী প্রেমিক হিসেবে পরিচিত, যার ব্যর্থতা ও আত্মবিনাশ এক মিথ হয়ে উঠেছে। তবে তামিল নির্মাতা অরুণ মাথেশ্বরনের নতুন ছবি ‘ডিসি’ এই চেনা দেবদাসকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগতে নিয়ে এসেছে। এখানে দেবদাস মদে ডুবে নিঃশেষ হন না, বরং তাঁর হতাশা সহিংস রূপে ছড়িয়ে পড়ে। প্রেমের ব্যর্থতা তাঁকে আত্মবিনাশী না করে প্রতিশোধপরায়ণ করে তোলে। আজ ১৫ সেপ্টেম্বর শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিন উপলক্ষে দর্শকরা তাঁর এই সহিংস রূপ দেখতে পারেন।
ছবির নামের ‘ডি’ এসেছে দেবদাসের নতুন সংস্করণ ‘দাস’ থেকে, আর ‘সি’ মূলত চন্দ্রাকে কেন্দ্র করে। এই ছবির সবচেয়ে বড় চমক হলেন লোকেশ কঙ্গগরাজ, যিনি বর্তমান সময়ের একজন আলোচিত দক্ষিণি নির্মাতা। তিনি এই সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তাঁর অভিনীত দাস চরিত্রটি একজন পলাতক গ্যাংস্টার, যে একটি সশস্ত্র ডাকাত দলের সঙ্গে জড়িত। পুলিশের অস্ত্রের চালান লুট এবং একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যার পর পুলিশ তার পেছনে লাগে। কর্মকর্তা ভোগরাজকে (কৃষ্ণ দয়াল) ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ‘নিষ্ঠুর হও’ নির্দেশ দেয়, যার ফলে ভোগরাজ মরিয়া হয়ে দাস ও তার দলের পিছু নেয় এবং অনিবার্য সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়।
উপন্যাসের দেবদাস যেখানে ধীরে ধীরে নিজের জীবন নষ্ট করে, সেখানে ‘ডিসি’ সেই চিত্র সম্পূর্ণ উল্টে দেয়। দাসের ভেতরের যন্ত্রণা তাকে নিষ্ক্রিয় না করে বরং সহিংস করে তোলে। সে মানুষ হত্যা করে, পুলিশের সঙ্গে লড়াই করে, আবার একই সঙ্গে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ায়। এই দ্বৈততা তাকে প্রচলিত নায়ক নয়, বরং একজন অ্যান্টিহিরো হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
শরৎচন্দ্রের গল্পের পার্বতী এখানেও পার্বতীই, চরিত্রে অভিনয় করেছেন সানজানা কৃষ্ণমূর্তি। তবে এই পার্বতী জমিদারবাড়ির মেয়ে নন, তিনি একজন ক্লাব গায়িকা। দাসের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় খুব সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য। তারা একে অপরের কাছে অপরিচিত থাকার সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু এই অপরিচয়ই তাদের কাছে স্বীকারোক্তির নিরাপদ জায়গা হয়ে ওঠে। পার্বতী দাসের মায়ের প্রিয় গান গাওয়ায় দাসের মনে তার প্রতি টান তৈরি হয়। দুজনের মধ্যে অল্প সময়ের জন্য একধরনের আশ্রয় গড়ে ওঠে।
এই সম্পর্ককে দীর্ঘ সময় দেওয়ার সুযোগ পায় না ছবিটি। পুলিশের হামলায় পার্বতী আহত হয় এবং দাস আবার পালাতে বাধ্য হয়। কিন্তু এই সম্পর্কের স্বল্পস্থায়িত্বই নতুন দেবদাসের চরিত্রটি বোঝানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সে ভালোবাসতে চায়, কিন্তু তার জীবন এমন এক সহিংস বাস্তবতায় আটকে আছে, যেখানে ভালোবাসার জন্য সময় নেই। এরপর গল্পে আসে চন্দ্রা, যা মূল ‘দেবদাস’-এর চন্দ্রমুখীর নতুন রূপ। ওয়ামিকা গাব্বির অভিনয়ে চন্দ্রা একজন যৌনকর্মী, যাকে শৈশব থেকেই একটি যৌনপল্লিতে আটকে রাখা হয়েছে। প্রায় ১৮ বছর ধরে সে বন্দী। প্রতিদিন অসংখ্য পুরুষের যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া এই নারী যখন দাসের সামনে আসে, তখন তার গল্প দাসকে নাড়া দেয়। সে চন্দ্রাকে সেই বন্দিদশা থেকে বের করে আনে এবং চন্দ্রাও স্বেচ্ছায় তার সঙ্গে চলে আসে।
‘ডিসি’র এই অংশটি অ্যাডাপ্টেশনের দিক থেকে সবচেয়ে আকর্ষণীয়। মূল ‘দেবদাস’-এ পার্বতী ও চন্দ্রমুখী নায়কের জীবনে দুটি ভিন্ন আবেগের প্রতীক। ‘ডিসি’ তাদের চরিত্রকে নতুন সামাজিক বাস্তবতায় স্থাপন করেছে। পার্বতী এখানে ক্ষণস্থায়ী ভালোবাসা, আর চন্দ্রা হয়ে উঠেছে বন্দিত্ব থেকে মুক্তির প্রতীক। দাস ও চন্দ্রার সম্পর্ক কেবল প্রেম নয়; এটি দুজন বিধ্বস্ত মানুষের একে অপরের মধ্যে নিজেদের ক্ষত চিনে নেওয়ার গল্প। চন্দ্রার সঙ্গে দাসের সম্পর্ককে ‘বনি অ্যান্ড ক্লাইড’-এর সঙ্গে তুলনা করা যায়। যৌনপল্লির দেয়ালে থাকা আর্থার পেনের ছবির পোস্টারও সেই ইঙ্গিতই দেয়। তবে ‘ডিসি’ শেষ পর্যন্ত শুধু সেই বিখ্যাত অপরাধী-জুটির অনুকরণে আটকে থাকে না, বরং দাস ও চন্দ্রাকে নিয়ে নিজের নতুন এক দুনিয়া তৈরি করতে চায়, যেখানে প্রেমের চেয়ে বেঁচে থাকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এই সম্পর্কের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যগুলোর একটি হলো চন্দ্রার প্রথম সমুদ্র দেখা। জীবনের এত দীর্ঘ সময় চার দেয়ালের মধ্যে কাটানোর পর বিশাল সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে তার বিস্ময় দর্শককে চরিত্রটির অতীত বুঝতে সাহায্য করে। কোনো বড় সংলাপ ছাড়াই মুকেশ জির ক্যামেরা সেই মুহূর্তটিকে বড় করে তোলে। আরেকটি দৃশ্যে দাস চন্দ্রার আঙুল খুঁজে নেয়—ঘনিষ্ঠতার জন্য নয়, শুধু নিশ্চিত হওয়ার জন্য যে সে এখনো তার পাশে আছে। এমন ছোট ছোট দৃশ্যগুলোই ‘ডিসি’কে নিছক গ্যাংস্টার ছবি হয়ে উঠতে দেয় না।
অরুণ মাথেশ্বরনের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর দৃশ্য নির্মাণ। ‘সানি কায়িধাম’ ও ‘ক্যাপ্টেন মিলার’-এর মতো ছবিতে তিনি যে স্টাইলাইজড সহিংসতার ভাষা তৈরি করেছেন, ‘ডিসি’তেও তার ব্যবহার করেছেন। অ্যাকশন দৃশ্যগুলোর কোরিওগ্রাফি, রক্তপাতকে নান্দনিকভাবে ফ্রেমবন্দী করা, এবং ক্যামেরা ও সম্পাদনার সমন্বয়ে সহিংসতাকে প্রায় কবিতার মতো উপস্থাপন করা হয়েছে। বিশেষ করে দাস ও চন্দ্রার সাক্ষাতের পরের দীর্ঘ করিডর-অ্যাকশন দৃশ্যটি ছবির অন্যতম সেরা অংশ। অনিরুদ্ধ রবিচন্দ্রনের ‘রাগা অব রিভেঞ্জ’ বাজতে শুরু করলে রক্তাক্ত সংঘর্ষটি কেবল অ্যাকশন থাকে না, যেন দুই চরিত্রের পুরোনো জীবন শেষ হয়ে নতুন জীবনের শুরু হয়।
আরেকটি দুর্দান্ত মুহূর্ত তৈরি হয়েছে ‘বাম বা দিগা’ গানে। একদিকে দেখা যায় দাসের ওপর পুলিশের নির্যাতন, অন্যদিকে চন্দ্রার ওপর চলা যৌন নিপীড়ন। গানটি প্রাণবন্ত, প্রায় আনন্দময়; অথচ পর্দায় চলছে ভয়াবহ সহিংসতা। এই অদ্ভুত বৈপরীত্য দুই চরিত্রের আলাদা বন্দিত্বকে এক জায়গায় নিয়ে আসে। তাদের শরীর ভিন্ন জায়গায় বন্দী, কিন্তু যন্ত্রণার অভিজ্ঞতা একই। ‘ডিসি’র সংগীত তাই শুধু দৃশ্যের পেছনে বাজে না, অনেক সময় দৃশ্যের আবেগ তৈরি করে। অনিরুদ্ধের আবহসংগীত ছবির অন্যতম বড় শক্তি। কোথাও কোথাও মনে হয়, চিত্রনাট্য যে আবেগ পুরোপুরি তৈরি করতে পারেনি, সংগীত সেটিকে পূরণ করছে। ফলে ‘ডিসি’ দেখার অভিজ্ঞতা অনেকটাই অনিরুদ্ধের সংগীতের ওপর নির্ভর করে। মুকেশ জির ক্যামেরায় মাটির কাছাকাছি থাকা রঙের সঙ্গে রক্তের লালকে বারবার আলাদা করে তোলা হয়েছে। চন্দ্রার যৌনপল্লির ঘরকে প্রায় পরাবাস্তব এক ক্যানভাসের মতো সাজানো হয়েছে। দেয়ালে ভ্যান গঘ ও দালির ছবি, বড় বড় দেয়ালচিত্র, উজ্জ্বল রং—সবকিছু চরিত্রটির বন্দিত্বের ভেতরের অদ্ভুত জগৎকে তুলে ধরে।
চন্দ্রার সাজেও রয়েছে আরেকটি সিনেম্যাটিক ইঙ্গিত। শাড়ি, টকটকে লাল লিপস্টিক, চুলে লাল গোলাপ—সব মিলিয়ে সিল্ক স্মিতার স্মৃতি উসকে দেয়। এক দৃশ্যে তাকে ‘সিল্ক’ বলেও ডাকা হয়। দাসের হাতে রুপালি কড়া আবার বিজয়ের ‘মাস্টার’ ছবির কথা মনে করিয়ে দেয়।
তবে এত সব নান্দনিকতা সত্ত্বেও ‘ডিসি’র সবচেয়ে বড় সমস্যা চিত্রনাট্যে। ছবির গল্পের কাঠামো যতটা চমকপ্রদ, চরিত্র নির্মাণ ততটা গভীর নয়। পুলিশি দুর্নীতি, অপরাধীদের প্রতি রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, নারী নির্যাতন—এতগুলো বিষয় ছবিতে এসেছে, কিন্তু সব কটিকে সমান গভীরতায় অনুসন্ধান করা হয়নি। ফলে কোনো কোনো জায়গায় মনে হয়, গল্পের ফাঁকা জায়গা পূরণ করতে অ্যাকশন ব্যবহার করা হয়েছে। ১৪২ মিনিটের দৈর্ঘ্যও তখন কিছুটা বেশি মনে হয়। একের পর এক বন্দুকযুদ্ধ, ছুরিকাঘাত ও হত্যাকাণ্ড দর্শককে রোমাঞ্চ দিলেও সব সময় আবেগগতভাবে নাড়া দিতে পারে না।
দাস চরিত্রটিও একই সমস্যায় ভোগে। লোকেশের অভিনয়ে সংযম আছে, চোখে রাগ আছে, শরীরী ভাষায় যন্ত্রণা আছে। তিনি চিৎকার করে আবেগ প্রকাশ করেন না; নীরবতাতেই চরিত্রটিকে বহন করেন। প্রথমবার অভিনেতা হিসেবে তাঁর স্বচ্ছন্দ উপস্থিতি নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ। কিন্তু চিত্রনাট্য চরিত্রটির ভেতরের দ্বন্দ্বকে যতটা গভীরভাবে অনুসন্ধান করা দরকার ছিল, তা করেনি। ফলে কোথাও কোথাও দাস রহস্যময় না হয়ে অস্বচ্ছ মনে হয়—সে কেন এতটা সহিংস, তার নৈতিক সীমা কোথায়, সেই প্রশ্নের সব উত্তর মেলে না।
ওয়ামিকা গাব্বিও চন্দ্রাকে আকর্ষণীয় করে তুলেছেন। তাঁর অভিনয়ে একদিকে শিশুসুলভ বিস্ময়, অন্যদিকে পৃথিবীর কাছে বহুবার পরাজিত এক নারীর কঠোরতা। বন্দিত্ব থেকে বেরিয়ে এসে ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার পর চন্দ্রার আচরণে যে পরিবর্তন আসে, সেটি বিশ্বাসযোগ্য। তবে চন্দ্রাকে স্বাধীন নারীর চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করলেও ছবিটি পুরোপুরি পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের হতে পারে না। একজন পুরুষ তাকে উদ্ধার করবে, তারপর সে নিজের শক্তি আবিষ্কার করবে—এই পরিচিত কাঠামোই শেষ পর্যন্ত থেকে যায়। সানজানা পার্বতীর চরিত্রে সংযত অভিনয় করেছেন। চন্দ্রার বিপরীতে তাঁর চরিত্রের কোমলতা দাসের জীবনে দুই নারীর আলাদা অবস্থান স্পষ্ট করে। অন্যদিকে কিটি চরিত্রে অবিনাশ রঘুদেবন ও ভোগরাজের চরিত্রে কৃষ্ণ দয়ালও উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে নিষ্ঠুর পুলিশ কর্মকর্তা ভোগরাজ ছবির ক্ষমতার কাঠামোকে প্রতিনিধিত্ব করে।
ছবির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নৈতিকতা। দাস ও তার দল অপরাধী, কিন্তু তাদের পেছনে ছুটতে থাকা পুলিশও যখন ‘নিষ্ঠুর হও’ নির্দেশ পায়, তখন প্রশ্ন ওঠে—আইনের নামে সংঘটিত সহিংসতা কি অপরাধীদের সহিংসতার চেয়ে আলাদা?