মানুষ কিংবা পৃথিবীর অন্য কোনো জীবের জন্য চাঁদ অত্যন্ত প্রতিকূল একটি জায়গা। সেখানে শ্বাস নেওয়ার মতো বাতাস নেই, তাপমাত্রায় রয়েছে চরম ওঠানামা এবং প্রতিনিয়ত মহাজাগতিক বিকিরণ ও উচ্চশক্তির কণার মুখোমুখি হতে হয়। এসব কারণে নভোচারীদের স্পেসস্যুট ও মহাকাশযানে বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হয়। তবে মহাকাশ অভিযানের সময় নভোচারীদের শরীর, পোশাক কিংবা সরঞ্জামের সঙ্গে অনিবার্যভাবে যেসব অণুজীব চাঁদে পৌঁছাতে পারে, সেগুলো নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
নাসার বিজ্ঞানীদের নেতৃত্বে পরিচালিত নতুন এক গবেষণায় পাঁচ ধরনের ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া নিয়ে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে এসব অণুজীবের কয়েকটি চাঁদের পৃষ্ঠে বেশ কিছুদিন টিকে থাকতে পারে। এই ফলাফল চাঁদে পৃথিবীর জীবনের অনিচ্ছাকৃত স্থানান্তর বা দূষণ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
গবেষণায় চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছের তিনটি অঞ্চল—নোবিলে রিম, কানেক্টিং রিজ ও দ্য গেরলাশ রিম নিয়ে মডেলিং সিমুলেশন করা হয়। এ ক্ষেত্রে নাসার লুনার রিকনাইসেন্স অরবিটারের পর্যবেক্ষণ এবং বিকিরণের মাত্রাসংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। গ্রহবিজ্ঞানী ও গবেষণাটির প্রধান লেখক প্রাবাল সাক্সেনা জানান, সিমুলেশনে দেখা গেছে চাঁদের কিছু গর্ত, যেখানে স্থায়ীভাবে সূর্যের আলো পৌঁছায় না, সেখানে কয়েকটি অণুজীব কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। বিশেষ করে শরৎ ও শীতকালে তাদের টিকে থাকার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
গবেষণায় পরীক্ষা করা দুটি ছত্রাক তিন ধরনের ব্যাকটেরিয়ার তুলনায় বেশি সহনশীল ছিল। এর মধ্যে ‘অ্যাসপারগিলাস নাইজার’ বা ‘ব্ল্যাক মোল্ড’ সবচেয়ে বেশি টিকে থাকার সক্ষমতা দেখিয়েছে। সাধারণত উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই ছত্রাকটি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনেও পাওয়া গেছে। এছাড়া ফিউজারিয়াম গোত্রের ছত্রাকও বেশ সহনশীলতা প্রদর্শন করেছে।
অন্যদিকে, ডেইনোকক্কাস রেডিওডুরানস, স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস এবং ব্যাসিলাস সাবটিলিস—এই তিন ধরনের ব্যাকটেরিয়া নিয়ে পরীক্ষা চালানো হয়। সাক্সেনা জানান, ব্যাকটেরিয়াগুলো অতিবেগুনি রশ্মির (ইউভি) প্রতি তুলনামূলকভাবে কম সহনশীল হওয়ায় তাদের টিকে থাকার হার ছত্রাকের তুলনায় কম ছিল। তবে ডেইনোকক্কাস ব্যাকটেরিয়াটি সবচেয়ে বেশি সহনশীলতা দেখিয়েছে।
গবেষকদের মতে, ইউভি রশ্মি ও তাপমাত্রা অণুজীবগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। চাঁদের দিনের তাপমাত্রা প্রায় ১২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে। এর পাশাপাশি উচ্চশক্তির কণার বিকিরণ এবং চাঁদের পৃষ্ঠের প্রাকৃতিক শূন্যতাও অণুজীবগুলোর টিকে থাকার পথে বড় বাধা। তবে মডেলিংয়ে এমন কিছু ‘টিকে থাকার উপযোগী অঞ্চল’ চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে কয়েক মাইল প্রশস্ত গর্তের তলদেশও রয়েছে।
গবেষণার সহলেখক এবং গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের জৈব-ভূরসায়নবিদ হিদার গ্রাহাম স্পষ্ট করেছেন যে, এই গবেষণায় অণুজীবগুলোর কোষের টিকে থাকার বিষয়টি দেখা হয়েছে, তাদের বৃদ্ধি বা বংশবিস্তার নয়। তিনি বলেন, ‘এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে যেখানে কোষগুলো মাটির নিচে চাপা পড়ে উষ্ণ থাকবে এবং বিকিরণ থেকে সুরক্ষা পাবে। আবার তরল পানির ছোট আধার তৈরি হলে সেখানে অণুজীবগুলোর বেড়ে ওঠার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।’
তবে চাঁদের পরিবেশ অণুজীবগুলোর মধ্যে কোনো জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে তাদের আরও ক্ষতিকর রোগজীবাণুতে পরিণত করবে কি না, তা এই গবেষণায় পরীক্ষা করা হয়নি। গ্রাহাম জানান, গবেষণায় মিউটেশন নয়, কেবল কোষের টিকে থাকার বিষয়টিই গুরুত্ব পেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীন ১৯৭২ সালের পর প্রথমবারের মতো আবার নভোচারীদের চাঁদের পৃষ্ঠে পাঠানোর এবং সেখানে দীর্ঘমেয়াদি ঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। নাসার আর্টেমিস কর্মসূচির আওতায় চাঁদের দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে নভোচারী পাঠানোর লক্ষ্য রয়েছে। এ অবস্থায় পৃথিবীর অণুজীব দিয়ে চাঁদের পরিবেশ দূষিত হওয়ার আশঙ্কা বিজ্ঞানীদের উদ্বিগ্ন করছে, কারণ এতে চাঁদ নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফল প্রভাবিত হতে পারে।
সাক্সেনা বলেন, ‘চাঁদের দক্ষিণ ও উত্তর মেরুতে এমন উল্লেখযোগ্য কিছু অঞ্চল রয়েছে, যেখানে মানুষের সঙ্গে সম্পর্কিত সাধারণ অণুজীবগুলো বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও অনুসন্ধান কার্যক্রমকে প্রভাবিত করার মতো দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে।’
গ্রাহাম বলেন, ‘অনিচ্ছাকৃত জীব স্থানান্তর বলতে আমরা বোঝাচ্ছি, মানুষ তাদের স্পেসস্যুট, কোনো সরঞ্জাম বা যন্ত্রের মাধ্যমে অনিচ্ছাকৃতভাবে চাঁদের পৃষ্ঠে অণুজীব পৌঁছে দিচ্ছে।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, এই অণুজীবের সহনশীলতার কারণে ভবিষ্যতে চাঁদ থেকে সংগ্রহ করা নমুনার বিশ্লেষণে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। এতে চাঁদের নিজস্ব রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য আর পৃথিবী থেকে নিয়ে যাওয়া উপাদানের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়বে।
পরিশেষে, দূষণ পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয় বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। তাই পৃথিবী থেকে কী কী সঙ্গে নেওয়া হচ্ছে, তা নথিবদ্ধ ও শনাক্ত করার ওপর জোর দিয়েছেন তারা। এর মাধ্যমেই ভবিষ্যতে চাঁদের নিজস্ব উপাদানের সঙ্গে পৃথিবী থেকে যাওয়া অণুজীব বা উপাদানের পার্থক্য করা সম্ভব হবে বলে মত দিয়েছেন গবেষকরা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাধ্যতামূলক অবসর-বদলি নিয়ে দুশ্চিন্তায় পুলিশ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আর্টেমিস-২ মিশন / চাঁদ ঘুরে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরলেন ৪ নভোচারী। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নরসিংদীতে কাঠ পুরিয়ে কারখানা সচল রাখার চেষ্টা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যুক্তরাজ্যের বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধের পেছনে ইরানের সাইবার হামলা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ম্যাকাই টেস্ট / এবার দুই দিনেই বিব্রতকর রেকর্ড গড়ে ইনিংস ব্যবধানে হারল বাংলাদেশ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চাঁদের সঙ্গে সংঘর্ষের পথে স্পেসএক্সের রকেট। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এক্সপ্লেইনার / চাঁদ-তারা যেভাবে ইসলামের প্রতীক হলো। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এক্সপ্লেইনার / আর্টেমিসের তোলা চাঁদের ছবিগুলো যে কারণে ‘গুরুত্বপূর্ণ’।