গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে অবস্থিত সরকারি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের (বালিকা) তত্ত্বাবধায়ক মো. সেতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি, হুমকি ও নানা অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত শেষে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে বিভাগীয় শুনানিতে অভিযোগ ‘সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি’—এমন কারণ দেখিয়ে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এবং সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে অধিকতর তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রতিষ্ঠান) মোহা. কামরুজ্জামান জানিয়েছেন, সেতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে পুনরায় অধিকতর তদন্ত করা হবে। বর্তমানে তাঁকে অধিদপ্তরে ওএসডি করা হয়েছে। এর আগে গত বছরের ১০ নভেম্বর ঢাকার বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের পরিচালক ও যুগ্ম সচিব আয়েশা আক্তার কেন্দ্রটি পরিদর্শন করে নিবাসী ও কর্মরত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেন। ৮ ডিসেম্বর জমা দেওয়া সেই প্রতিবেদনে ভয়াবহ সব তথ্য উঠে আসে।
পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ছয়জন নিবাসী তত্ত্বাবধায়কের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, সেতারুজ্জামান ছুটির দিন, সন্ধ্যা কিংবা রাতে কিশোরীদের একা কক্ষে ডেকে নিয়ে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় হাত দিতেন। এক কিশোরী জানিয়েছে, আত্মরক্ষার্থে সে সেতারুজ্জামানের হাতে কামড় দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিল। এছাড়া বাথরুমে গিয়ে সময় কাটানোর প্রস্তাব দেওয়া এবং মুঠোফোনে পর্নোগ্রাফি ভিডিও দেখতে বাধ্য করার মতো অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
তত্ত্বাবধায়কের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, তিনি বিবাহিত কিশোরীদের স্বামীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের বিষয়ে ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতেন এবং সন্তান না হওয়ার কারণ জানতে চাইতেন। স্বামীকে কেন্দ্রে ডেকে এনে কিশোরীর সঙ্গে একান্তে সময় কাটানোর সুযোগ করে দেওয়ার প্রস্তাবও তিনি দিতেন। এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানালে বা প্রতিবাদ করলে তিনি কিশোরীদের স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার হুমকি দিতেন।
প্রতিবেদনে আরও উঠে আসে যে, সেতারুজ্জামান ‘মা-বাবা এসেছেন’ বলে মিথ্যা কথা বলে কিশোরীদের নিজের কক্ষে ডেকে নিতেন। এছাড়া নিবাসীদের পরিবারের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে টাকা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। যারা টাকা দিতে পারত না, তারা এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতো। এমনকি এক অন্তঃসত্ত্বা কিশোরীর গর্ভপাতের চেষ্টা করার মতো গুরুতর অভিযোগও পাওয়া গেছে।
কর্মরত ব্যক্তিদের ভাষ্যমতে, কেস ওয়ার্কার ছাড়া কিশোরীদের একা কক্ষে ডাকা নিয়মবিরুদ্ধ হলেও সেতারুজ্জামান তা মানতেন না। তিনি নারী কর্মীদের সঙ্গেও অশোভন আচরণ করতেন এবং তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত বিষয়ে বিব্রতকর ইঙ্গিত করতেন। গত বছরের ১৫ জুলাই নিবাসীরা উপপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিলেও তখন কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো অভিযোগকারী কিশোরীদের জামিন আটকে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হতো।
গত বছরের ৩০ অক্টোবর কেন্দ্রের এক সমাবেশে সেতারুজ্জামান পুনরায় হুমকি দিলে নিবাসীরা ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁর কক্ষের আসবাবপত্র ভাঙচুর করে। আয়েশা আক্তারের প্রতিবেদনে একে নিবাসীদের ‘দীর্ঘদিনের জমা হওয়া ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। প্রতিবেদনে সেতারুজ্জামানকে দ্রুত বদলি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল। এমনকি তিনি তদন্তকারী কর্মকর্তা আয়েশা আক্তারকেও ‘বডি শেমিং’ করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
সেতারুজ্জামান অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার। গত বছরের ২৮ অক্টোবর অতিরিক্ত পরিচালক মো. শহীদুল ইসলাম কেন্দ্র পরিদর্শনে এলে কয়েকজন কর্মচারী গোপনে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন বলে তিনি দাবি করেন। ১৯ আগস্ট মুঠোফোনে তিনি জানান, তিনি আর ওই কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করছেন না এবং তাঁর মা অসুস্থ।
গত বছরের ৮ ডিসেম্বর বিভাগীয় কার্যালয় তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি চাকরির শৃঙ্খলাপরিপন্থী অসদাচরণ ও ফৌজদারি অপরাধের লিখিত অভিযোগ আনে। এরপর ২৫ জানুয়ারি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, তিনি নিবাসীদের সঙ্গে অসদাচরণ ও দুর্নীতিতে লিপ্ত ছিলেন। ২৬ এপ্রিল তাঁকে অভিযোগনামা দেওয়া হয় এবং ১ জুলাই ব্যক্তিগত শুনানি হয়। তবে শুনানিতে এক নার্স উপস্থিত না হওয়ায় অভিযোগের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে মন্ত্রণালয় তাঁকে অব্যাহতি দেয়।
অব্যাহতির পর গত ২৮ জুলাই সেতারুজ্জামান পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে ১৩ আগস্ট মন্ত্রণালয়ের নতুন প্রজ্ঞাপনে তাঁকে সমাজসেবা অধিদপ্তরে সহকারী পরিচালক (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) হিসেবে বদলি করা হয়। বর্তমানে মোহাম্মদ বোরহান উদ্দিন গত ৩১ অক্টোবর থেকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে কেন্দ্রটি পরিচালনা করছেন।
তদন্তকারী কর্মকর্তা আয়েশা আক্তার এই অব্যাহতির সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট নন। তিনি মনে করেন, তদন্তের সুপারিশ অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন ছিল। শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী, আইনের সংস্পর্শে আসা শিশুদের সুরক্ষার জন্য এই কেন্দ্রগুলো পরিচালিত হয়। কিন্তু তত্ত্বাবধায়কের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ সেই নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরই বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গত ৮ ডিসেম্বর পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়, ছয়জন নিবাসী নিজেদের এবং অন্যদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া যৌন হয়রানির বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আরেক কিশোরীর অভিযোগ, তাকে বাথরুমে গিয়ে একসঙ্গে পাঁচ মিনিট সময় কাটাতে বলতেন তত্ত্বাবধায়ক। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সেই অভিযোগ জেলা ও বিভাগীয় দপ্তর ঘুরে সমাজসেবা অধিদপ্তরের সদর দপ্তরে পৌঁছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কর্মরত ব্যক্তিরা তাঁকে অন্য একটি কক্ষে নিয়ে তালা দিয়ে আটকে রাখতে বাধ্য হন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অভিভাবকদের কাছ থেকে ঘুষ ও উপহার নিয়ে তিনি কাউকে কাউকে বাড়তি সুবিধা দিতেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কোনো কোনো অভিভাবককে বাইরে থেকে খাবার আনার অনুমতিও দিয়েছিলেন তিনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গর্ভপাতের অভিযোগ ছাড়াও জামিন হওয়ার পর এক কিশোরীকে নির্ধারিত সময়ের পর আরও ১০ দিন কেন্দ্রে রাখাসহ বিভিন্ন অভিযোগ এতে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রাষ্ট্রপতির আদেশে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ আবু ইউছুফ স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ (৩ খ এবং ঘ) অনুযায়ী অসদাচরণ ও দুর্নীতিতে লিপ্ত থাকার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত।