বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রাণশক্তি হলো প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই মানুষ কর্মসংস্থান, নিরাপদ জীবন কিংবা নতুনত্বের সন্ধানে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পাড়ি জমিয়েছে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক অভিবাসন প্রক্রিয়ার অংশ এবং প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সংকট মোকাবিলায় রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরতা বেড়েই চলেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের সংকটাপন্ন অর্থনৈতিক মুহূর্তে প্রবাসী আয় বৃদ্ধির দিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। যেহেতু সরকার চাইলেই বৈদেশিক মুদ্রা ছাপাতে পারে না, তাই রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোই এখন বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা, নিরাপদ আশ্রয়, উন্নত জীবনের প্রত্যাশা কিংবা নব আবিষ্কারের নেশাসহ প্রভৃতি কারণে সভ্যতার শুরু থেকে মানুষ একস্থান থেকে অন্যস্থানে ছুটে বেড়াচ্ছে। বাংলাদেশ চাইলেই সহজেই রপ্তানি আয় বৃদ্ধি করতে পারবে না কিন্তু বিশেষ কিছু পক্ষেপের মাধ্যমে সহজেই প্রবাসী আয় (রেমিটেন্স প্রবাহ) বৃদ্ধি করতে পারবে।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৬ থেকে ২০২৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৪৮ লাখ ৭৪ হাজার ৫৪৭ জন বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। বর্তমানে প্রায় ১ কোটি বাংলাদেশি বিদেশে কর্মরত আছেন বলে ধরা যায়। হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি প্রবাসী যদি মাসে অন্তত ৫০০ মার্কিন ডলার ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে পাঠাতেন, তবে বার্ষিক রেমিট্যান্স আয় ৬০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাত। অথচ ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে এই আয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার, যা সম্ভাব্য আয়ের মাত্র ৪০ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট যে, অর্ধেকেরও বেশি বা প্রায় ৬০ শতাংশ রেমিট্যান্স হুন্ডি কিংবা অন্যান্য অবৈধ পথে দেশে আসছে। রেমিট্যান্সের ওপর সরকারের ২.৫ শতাংশ প্রণোদনা সত্ত্বেও আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে না। তবে, এই সংখ্যায় ফিরে আসা ব্যক্তিরে তথ্য অন্তর্ভুক্ত নয়। যদি প্রত্যেক প্রবাসী রেমিট্যান্স প্রতিমাসে ন্যূনতম ৫০০ মার্কিন ডলার ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে প্রেরণ করেন, সেক্ষেত্রে দেশের বার্ষিক মোট প্রবাসী আয় হওয়ার কথা ৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রবাসী আয় বৃদ্ধির জন্য সরকার রেমিট্যান্সের ওপর ২.৫ শতাংশ ইনসেন্টিভ প্রদান করছে যা রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে সহায়তা করার কথা, কিন্তু বাস্তবিক অর্থে প্রবাসী আয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায় নাই। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা: আমরা যদি প্রবাসী রেমিট্যান্স আয় ৪০ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ৭০ শতাংশ বা ৮০ শতাংশে উন্নীত করতে চাই, সেক্ষেত্রে প্রবাসী রেমিট্যান্সের রেট (টাকা-ডলার) নির্ধারণের ক্ষেত্রে রেমিট্যান্স প্রেরণকারী ভিন্ন ভিন্ন রেট নির্ধারণ করতে হবে যা ওই দেশে। হুন্ডি রেট সংগ্রহের জন্য স্ব স্ব দেশে অবস্থিত বাংলাশে দূতাবাস অথবা বাংলাদেশি ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি কোনো রেমিট্যান্স হাউজ থাকলে তাদের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। যেহেতু ভিন্ন ভিন্ন দেশের রেট ভিন্ন ভিন্ন হবে, সেক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশভিত্তিক রেমিট্যান্স আহরণের রিপোর্ট প্রণয়দের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
প্রবাসী আয় বাড়াতে স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশভিত্তিক বিনিময় হার নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ওমান, বাহরাইন, ইতালি ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো থেকে যারা রেমিট্যান্স পাঠান, তাদের জন্য পৃথক বিনিময় হার নির্ধারণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। মূলত ওইসব দেশে প্রচলিত হুন্ডি রেটের চেয়ে ব্যাংকিং চ্যানেলের রেট যেন কিছুটা বেশি থাকে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে বাংলাদেশি দূতাবাস বা সংশ্লিষ্ট দেশের ব্যাংকিং সাবসিডিয়ারিগুলোর মাধ্যমে নিয়মিত হুন্ডি রেট যাচাই করে প্রতিদিন বিনিময় হার সমন্বয় করতে হবে। এতে এগ্রিগেটর বা ব্যাংকগুলো ওয়েটেড এভারেজ রেট নিরূপণ করে আমদানি-রপ্তানির ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হবে।
দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ক্ষেত্রে কেবল উচ্চমূল্যে ডলার কিনে হুন্ডি মোকাবিলার নীতি ৩ থেকে ৫ বছরের বেশি চালানো সম্ভব নয়, কারণ এটি অভ্যন্তরীণ বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এই ৩-৫ বছরের মধ্যে প্রবাসীদের ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠানোয় অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। পাশাপাশি, প্রবাসীদের সার্বিক কল্যাণে দেশে ও বিদেশে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি, যাতে তারা দীর্ঘমেয়াদে বৈধ পথে টাকা পাঠাতে আগ্রহী হন। এর বাইরেও আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার আলোকে দক্ষ শ্রমিক তৈরি, অভিবাসন ব্যয় হ্রাস এবং বিভিন্ন দেশে বৈধ অভিবাসীর সংখ্যা বাড়াতে বিশেষ নজর দিতে হবে।
প্রবাসী আয় পুরোপুরি ব্যাংকিং চ্যানেলে ফিরিয়ে আনতে পারলে দেশের অর্থনীতির আমূল পরিবর্তন সম্ভব। এর ফলে আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থাকবে, যা ট্রেড গ্যাপ কমিয়ে আনবে। এছাড়া টাকার মান শক্তিশালী হবে এবং দেশ থেকে অর্থপাচার রোধ করা সম্ভব হবে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের টেকসই উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।