চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী এলাকার একটি জাহাজভাঙা কারখানায় স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ার মর্মান্তিক ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে আটজনে দাঁড়িয়েছে। শুক্রবার সকালে স্টেশন রোড সংলগ্ন ফেরদৌস স্টিল নামের একটি ইয়ার্ডে এই দুর্ঘটনা ঘটে। প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, জাহাজটি পূর্বে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বহনের কাজে ব্যবহৃত হতো এবং নিয়ম অনুযায়ী এটি সম্পূর্ণ গ্যাসমুক্ত না করেই কাটার কাজ শুরু করা হয়েছিল। এর ফলে ট্যাংকের ভেতরে জমে থাকা কার্বন মনোক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড বা ফ্লোরিনের মতো ঘাতক গ্যাস আকস্মিকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, যা কর্মরত শ্রমিকদের তাৎক্ষণিক মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়।

দুর্ঘটনার দিন সকালে কারখানাটির ভেতর থেকে শ্রমিকদের আর্তনাদ ভেসে আসতে শুরু করে। স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে অসুস্থ শ্রমিকদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। তবে ততক্ষণে জাহাজের অভ্যন্তরে বেশ কয়েকজন শ্রমিক নিথর হয়ে পড়ে থাকেন। এই মর্মান্তিক সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় জনতা ক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং কারখানার ভেতরে প্রবেশ করে ভাঙচুর চালান। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এছাড়া পার্শ্ববর্তী সাগরে ইলিশ ধরতে যাওয়া জেলেরা জানান, গ্যাসের তীব্র গন্ধের কারণে তাঁরা উপকূলের কাছাকাছি ভিড়তে পারেননি এবং স্বাভাবিকের চেয়ে অন্তত আধা কিলোমিটার দূরে নৌকা নোঙর করতে বাধ্য হন, যা থেকে বোঝা যায় গ্যাসের বিষাক্ততার মাত্রা কতটা মারাত্মক ছিল।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, কারখানা থেকে দু দফায় আহত ও মৃত শ্রমিকদের হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। এর মধ্যে বেশ কয়েকজনকে মৃত অবস্থাতেই জরুরি বিভাগে আনা হয়। নিহতদের মধ্যে সানি জলদাস, পলাশ জলদাস এবং দুই সহোদর মনসুর আলী ও নাসির উদ্দিনের পরিচয় নিশ্চিত করা গেছে, যাঁরা সকলেই স্থানীয় ভাটিয়ারী অঞ্চলের বাসিন্দা। জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে যোগ দেন। ফায়ার সার্ভিসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ জাহাজ কাটার আগে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা প্রটোকল কঠোরভাবে মেনে গ্যাস ফ্রি সার্টিফিকেট নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক হলেও সংশ্লিষ্ট কারখানা কর্তৃপক্ষ চরম অসতর্কতা ও অবহেলার পরিচয় দিয়েছে।

বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্প দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশগত ঝুঁকি এবং শ্রমিকদের দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য সমালোচিত হয়ে আসছে। বারবার দুর্ঘটনা ঘটার পরও ইয়ার্ড মালিকদের একাংশের মধ্যে আইন মানার অনীহা এবং তদারকি সংস্থার নজরদারির অভাব শ্রমিকদের জীবনকে চরম ঝুঁকিতে ফেলছে। সীতাকুণ্ডের এই সর্বগ্রাসী দুর্ঘটনা আবারও ইয়ার্ডগুলোতে পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিধানের ব্যর্থতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। ঘটনার পর থেকে কারখানা কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল কোনো বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া না গেলেও নিহতদের পরিবারে শোকের মাতম চলছে। সচেতন মহল ও শ্রমিক অধিকার সংগঠনগুলো অবিলম্বে এই ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার, ইয়ার্ড মালিকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং দেশের প্রতিটি জাহাজভাঙা কারখানায় আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন।