ডারউইনের সবুজ উইকেটে অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বমানের বোলিং আক্রমণ সামলে টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি তুলে নিলেন বাঁহাতি ওপেনার তানজিদ হাসান। প্যাট কামিন্স, জশ হ্যাজলউড ও ওয়েবস্টারদের মতো বোলারদের বিপক্ষে ১৮৮ বলে তিন অঙ্কের ম্যাজিক ফিগারে পৌঁছান তিনি। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট ক্রিকেটে কোনো বাংলাদেশি ব্যাটারের এটিই প্রথম সেঞ্চুরি। নিজের দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নেমেই এমন কীর্তি গড়ে তানজিদ প্রমাণ করলেন, লাল বলের ক্রিকেটেও তিনি লম্বা রেসের ঘোড়া।

তানজিদকে অবশ্য নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। এর আগে ৪০টি ওয়ানডে ও ৫৩টি টি-টোয়েন্টি খেলেছেন তিনি। টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে ১৩টি ফিফটি এবং ওয়ানডেতে ৯টি ফিফটির পাশাপাশি একটি সেঞ্চুরিও রয়েছে তার নামের পাশে। তবে টেস্টে তার এই ইনিংসটি ছিল বিশেষ। ইনিংসের ৬৪তম ওভারের শেষ বলে নাথান লায়নকে লং অফে ঠেলে এক রান নিয়ে নাজমুল হোসেনের সঙ্গে মাঝ উইকেটে দেখা হওয়ার সময় শূন্যে লাফিয়ে উঠে নিজের সেঞ্চুরি উদ্‌যাপন করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ১৯৭ বল খেলে ১০১ রান করে আউট হন এই তরুণ ব্যাটার।

মুমিনুল হকের সঙ্গে দ্বিতীয় উইকেটে ১০২ রানের একটি গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়েছিলেন তানজিদ। মুমিনুল ফিফটির খুব কাছে গিয়ে আউট হলেও তাদের এই জুটি বাংলাদেশকে বড় সংগ্রহের পথে এগিয়ে দেয়। আগের দিন সাদমান ইসলাম ও আজ মুমিনুলের উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় ২৩০/২। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের ১৯৮ রানের চেয়ে বাংলাদেশ তখন ৩২ রানে এগিয়ে ছিল। তানজিদের ব্যাটিংয়ের ধরন দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে এটি তার মাত্র দ্বিতীয় টেস্ট। তার নান্দনিক ড্রাইভ, পেছনের পায়ে ভর করে খেলা পাঞ্চ এবং ওয়েবস্টারকে মারা ছক্কা ছিল দেখার মতো।

ম্যাচের আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে স্টিভেন স্মিথ দাবি করেছিলেন, ডারউইনের উইকেট বেশ ‘ট্রিকি’ এবং দ্বিতীয় দিনে ব্যাটিং করা কঠিন হবে। তবে স্মিথের এই মন্তব্যকে বাংলাদেশ দল ‘মাইন্ডগেম’ হিসেবেই দেখেছে। দলের এক সদস্যকে এই মন্তব্য শুনে হাসতেও দেখা গেছে। বাস্তবে উইকেটে তেমন কোনো জটিলতা ছিল না, যা তানজিদ, মুমিনুল ও নাজমুলের ব্যাটিংয়ে স্পষ্ট হয়েছে। বরং স্মিথের কথা অনুযায়ী যদি উইকেট কঠিনই হতো, তবে তানজিদের এই সেঞ্চুরির মাহাত্ম্য আরও বেড়ে যায়।

মজার ব্যাপার হলো, তানজিদের এই সেঞ্চুরিতে পরোক্ষভাবে অবদান রেখেছেন স্মিথ নিজেই। ব্যক্তিগত ৬২ রানের মাথায় তানজিদ স্লিপে ক্যাচ দিয়েছিলেন, কিন্তু স্মিথ তা লুফে নিতে ব্যর্থ হন। ডারউইনের উইকেট ‘ট্রিকি’ কি না তা নিয়ে সংশয় থাকলেও, স্লিপে দাঁড়িয়ে তানজিদের ক্যাচ নেওয়াটা যে বেশ ‘ট্রিকি’ ছিল, তা স্মিথের ব্যর্থতায় প্রমাণিত হয়েছে।

তানজিদের সেঞ্চুরির ঠিক আগেই অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত নিজের ফিফটি পূর্ণ করেন। অস্ট্রেলিয়াকে প্রথম ইনিংসে ১৯৮ রানে অলআউট করার পর বাংলাদেশ শেষ সেশনেই ১ উইকেটে ৯৬ রান তুলেছিল। সব মিলিয়ে ডারউইনে স্বাগতিকদের বিপক্ষে বাংলাদেশ এখন বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।

ওয়ানডেতে ৯ ফিফটির সঙ্গে তো সেঞ্চুরিও আছে একটি।

মুমিনুলের সঙ্গে দ্বিতীয় উইকেটে তারঁ ১০২ রানের জুটি ভেঙেছে ফিফটি থেকে মাত্র ১ রান দূরে থাকতে মুমিনুলেরই আউটে।

কিন্তু মুমিনুল আউট হয়ে যাওয়ায় ২০০৩ সালে কেয়ার্নসে দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে হাবিবুল বাশার ও হান্নান সরকারের ১০৮ রানের জুটিই এখনো সর্বোচ্চের আসীনে থেকে গেছে।

কাল ছিলেন হাসান মাহমুদ, আজ তানজিদ হাসান।

পেস বোলিংয়ের পর তানজিদের সৌজন্যে অস্ট্রেলিয়ানদের আগ্রহের কেন্দ্রে বাংলাদেশের ব্যাটিং।

তানজিদ কীভাবে এত ভালো ব্যাটিং করছেন!

গত মে মাসে সিলেটে পাকিস্তানের বিপক্ষে অভিষেক।

শুধু এতুটুকই নয়; টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে সেঞ্চুরি করেই থেকে যাওয়ার বার্তাটা দিলেন।

ড্রেসিংরুমের দিকে ঘুরে উঁচিয়েছেন ব্যাট।

মুশফিকুর রহিম–মুমিনুল হকরা যে রকম টেস্ট ক্যারিয়ারের অনেকগুলো বছর পার করে দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট খেলার সুযোগ পেলেন, তানজিদের ক্ষেত্রে বিষয়টি তেমন নয়।

তানজিদের ইনিংসটা সে কারণেই বিস্ময় হয়ে এসেছে অস্ট্রেলিয়ানদের কাছে।

আর একটু হলেই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ জুটিটা হয়ে যেতে পারত তাঁদের।

তানজিদের প্রথম ৫০ এসেছে ১০২ বলে, চার ছিল ৫টি।

পরের ৫০ আসে মাত্র ৮৬ বলে, মেরেছেন আরও তিনটি চার ও একটি ছক্কা।

কাজটাকে সত্যি সত্যি কঠিন করতে আজ সকাল থেকে মরিয়া চেষ্টা চালালো অস্ট্রেলিয়া।

কিন্তু বোলারদের গতি, বাউন্স, সুইংয়ের সঙ্গে ফিল্ডারদের কটু কথা—কিছুই মনঃসংযোগ ভাঙতে পারেনি তানজিদের।

তানজিদসহ প্রথমে মুমিনুল এবং পরে নাজমুল হোসেনের ব্যটিং দেখেও স্মিথের আগের দিনের বলা কথাটার সঙ্গে উইকেটের তেমন মিল খুঁজে পাওয়া গেল না।

অবশ্য বাংলাদেশ শিবিরে কালও কথাটা বিশ্বাসযোগ্যতা পায়নি।