দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা প্রাচ্যবিদদের একাংশের মধ্যে প্রচলিত ছিল যে, ইসলামি দর্শন মূলত প্রাচীন গ্রিক দর্শনেরই একটি অবিকল অনুবাদ বা অনুকরণ মাত্র। তাদের দাবি অনুযায়ী, সেমেটিক আরবদের মৌলিক চিন্তাধারা বা জটিল তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের সক্ষমতা ছিল না। তবে বিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত মিসরীয় মনীষী ও কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন অধ্যাপক মোস্তফা আবদুর রাজ্জাক তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘তামহিদ লি-তারিখিল ফালসাফাতিল ইসলামিয়্যাহ’ (ইসলামি দর্শনের ইতিহাসের ভূমিকা)-এর মাধ্যমে এই ভ্রান্ত ধারণাকে বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, ইসলামি দর্শনের শিকড় গ্রিক অনুবাদের বহু আগে থেকেই মুসলিম সমাজে বিদ্যমান ছিল।
মোস্তফা আবদুর রাজ্জাকের মতে, পশ্চিমা গবেষকরা দর্শন বলতে কেবল ‘মেটাফিজিক্স’ বা অধিবিদ্যাকে বুঝতেন এবং সেই মাপকাঠিতেই ইসলামি চিন্তাধারাকে বিচার করতে চেয়েছেন। অথচ ইসলামি দর্শনের প্রকৃত মৌলিকতা নিহিত রয়েছে ‘উসুলুল ফিকহ’ (ইসলামি আইনের মূলনীতি) এবং ‘ইলমুল কালাম’ (ধর্মতত্ত্ব)-এর মতো স্বতন্ত্র শাস্ত্রের ভেতর। তিনি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন যে, ইমাম শাফেয়ির প্রবর্তিত উসুলুল ফিকহ হলো জ্ঞানতত্ত্বের এমন এক স্বয়ংসম্পূর্ণ যুক্তিবিজ্ঞান, যা কোনো বাহ্যিক প্রভাব ছাড়াই একান্তই ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের ফসল। এটি গ্রিক লজিক বা যুক্তিবিদ্যার সমান্তরাল এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি অনন্য পদ্ধতি।
ইসলামে যুক্তিবাদ ও স্বাধীন গবেষণার (ইজতিহাদ) গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ থেকে অকাট্য প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন। সাহাবি মুআজ ইবনে জাবাল (রা.)-কে ইয়ামেনের বিচারক হিসেবে পাঠানোর সময় নবীজি (সা.)-এর সাথে তাঁর কথোপকথন এবং বনু কোরাইজা অভিযানের সময় সাহাবিদের স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়োগের ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, ইসলামে নিজস্ব বিচারবুদ্ধি ব্যবহারের সুযোগ ও নির্দেশনা বিদ্যমান। কোরআনের সূরা আরাফের ১৭৯ নম্বর আয়াতসহ অসংখ্য স্থানে বুদ্ধিহীনদের প্রতি কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে, যা ইসলামি দর্শনের ভিত্তি যে মুক্তচিন্তা, তা পুনর্ব্যক্ত করে।
মোস্তফা আবদুর রাজ্জাকের এই গবেষণা শুধু একটি ঐতিহাসিক দলিল নয়, বরং এটি ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাস পুনর্পাঠের একটি নতুন দুয়ার উন্মোচন করেছে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত এই গবেষণাপদ্ধতি পরবর্তী প্রজন্মের ড. আলি সামি আল-নাশশার এবং ড. মাহমুদ কাসিমের মতো পণ্ডিতদের গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তিনি দেখিয়েছেন যে, ফকিহ ও শাস্ত্রবিদরা যেভাবে ধর্ম ও দর্শনকে সমন্বিত করেছেন, তা ইতিহাসের এক অনন্য নজির। আধুনিক যুগে যখন ইসলামি দর্শনের আত্মপরিচয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন আবদুর রাজ্জাকের এই কাজ মুসলিম বিশ্বের জন্য মৌলিক বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধারের মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।