মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় বিরল এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে রাজধানীর স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজের তিন বোন। নাজিবা ইসলাম, নাবিলা ইসলাম ও নাফিসা ইসলাম নামের এই তিন বোন একই সঙ্গে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে প্রত্যেকেই জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। তাদের এই অভূতপূর্ব সাফল্যে পরিবার, শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানজুড়ে বইছে আনন্দের জোয়ার।
জানা গেছে, নাজিবা ও নাবিলা যমজ বোন এবং নাফিসা তাদের তুলনায় কিছুটা ছোট। তবে শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই এই তিন বোন একসঙ্গে পড়াশোনা চালিয়ে আসছে। তৃতীয় শ্রেণি থেকে শুরু করে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত তারা সবসময় একই শ্রেণিতে পড়ে এসেছে। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় তারা তিনজনেই বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অংশ নেয় এবং প্রতিটি বিষয়ে সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জন করে।
ফল প্রকাশের পরদিন রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন তিন বোনের গর্বিত বাবা নাদিমুল ইসলাম। মূলত কুমিল্লার বাসিন্দা হলেও ব্যবসার সুবাদে পরিবার নিয়ে ঢাকায় বসবাস করছেন তিনি। তিনি জানান, তার তিন মেয়ের এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে কঠোর পরিশ্রম, মেধা ও নিয়মিত অধ্যবসায়। বৈরী আবহাওয়া কিংবা ঝড়বৃষ্টি—কোনো কিছুই তাদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে বাধা হতে পারেনি। নিয়মিত স্কুলের ক্লাসের পাশাপাশি তারা বাসায় পড়াশোনা করেছে এবং অনলাইনে বিভিন্ন শিক্ষামূলক ক্লাসে অংশ নিয়েছে। তবে অতিরিক্ত কোচিংয়ের ওপর নির্ভর না করে তারা কেবল পরীক্ষার ঠিক আগে কিছু প্রস্তুতিমূলক সহায়তা নিয়েছে।
সন্তানদের পড়াশোনার পেছনে মায়ের অবদানের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন নাদিমুল ইসলাম। তিনি জানান, মেয়েদের ওপর কখনো পড়ালেখার অতিরিক্ত মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়নি। বরং ছোটবেলা থেকেই তাদের সঙ্গে একটি বন্ধুভাবুক সম্পর্ক বজায় রাখা হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার পাশাপাশি বই পড়া, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ, ছবি আঁকা এবং নিজস্ব আগ্রহের বিষয়গুলোতে জ্ঞান অর্জনে তাদের সবসময় উৎসাহ দেওয়া হতো। অভিভাবক হিসেবে তাদের এই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি মেয়েদের মানসিক বিকাশে বড় ভূমিকা রেখেছে।
এদিকে তিন বোনের এমন সাফল্যে উচ্ছ্বসিত তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মকর্তারাও। বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজের দশম শ্রেণির ‘সি’ শাখার শ্রেণি শিক্ষক ইসমত আরা এই তিন শিক্ষার্থীর প্রশংসা করে বলেন, তারা অত্যন্ত মেধাবী ও অনুগত শিক্ষার্থী। পড়াশোনার প্রতি তাদের একাগ্রতা ও ক্লাসে নিয়মিত উপস্থিতি ছিল সবসময় লক্ষ্যণীয়। বিদ্যালয়ের সব নিয়মকানুন তারা নিষ্ঠার সঙ্গে মেনে চলত এবং শিক্ষক ও সহপাঠীদের সঙ্গে তাদের আচরণ ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তাদের কারণে কখনো কোনো ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয়নি। এছাড়া তাদের অভিভাবকেরাও সবসময় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রেখেছেন এবং পড়াশোনার ক্ষেত্রে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন।
শিক্ষাবিদ ও সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, অভিভাবকের সঠিক দিকনির্দেশনা, সন্তানের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এবং শিক্ষার্থীদের নিজেদের দৃঢ় মনোবল থাকলে যেকোনো কঠিন লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। নাজিবা, নাবিলা ও নাফিসার এই সাফল্য আগামী দিনে দেশের অন্যান্য শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য একটি বড় অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।