২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের সঙ্গে খাবারের ছবি তোলার জেরে ডিএমপির তৎকালীন ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদকে দায়িত্ব থেকে সরানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বুধবার (১২ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ এই সংক্রান্ত একটি অডিও কথোপকথনের প্রতিলিপি উপস্থাপন করেছেন প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজন আসামির বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় প্রসিকিউশন এই অডিও রেকর্ডটি ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরে। কথোপকথনে সাবেক ডিবিপ্রধান হারুনকে নিজের বদলি ঠেকানোর জন্য ওবায়দুল কাদেরের কাছে অনুরোধ করতে শোনা যায়।

ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত প্রতিলিপি অনুযায়ী, হারুন দাবি করেন যে সমন্বয়কদের খাওয়ানোর সিদ্ধান্তটি তার একক ছিল না। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং এসবি প্রধানের নির্দেশেই তিনি খাবারের আয়োজন করেছিলেন এবং ছবি তোলার ব্যবস্থা করেছিলেন। হারুন বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায় নিয়মিত মিটিং হতো এবং সেখানে পাওয়া নির্দেশ মেনেই তিনি কাজ করেছেন।

কথোপকথনে ওবায়দুল কাদেরকে বলতে শোনা যায়, নেত্রী (শেখ হাসিনা) এই ঘটনায় অত্যন্ত বিরক্ত হয়েছেন। কাদের প্রশ্ন করেন, কেন হারুন ছবি তুলে তা বাইরে প্রচার করেছেন। জবাবে হারুন দাবি করেন, এসবি প্রধান মনিরুল ইসলামের নির্দেশেই ছবিগুলো প্রকাশ করা হয়েছিল। তিনি ওবায়দুল কাদেরকে অনুরোধ করেন যেন প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলা হয়।

হারুন আক্ষেপ করে বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আইজিপির নির্দেশে তিনি সব কাজ করেছেন, কিন্তু এখন তারা সেই দায় নিচ্ছেন না। তিনি ওবায়দুল কাদেরকে বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে কমিশনারের মাধ্যমে বদলির নির্দেশ দিয়েছেন। হারুন প্রশ্ন রাখেন, তার অপরাধ কী এবং কেন তাকে এভাবে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে কথোপকথনে হারুন বারবার দাবি করেন যে, তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশের বাইরে এক বিন্দুও কাজ করেননি। তিনি কাদেরকে বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেই সব সত্য বেরিয়ে আসবে। তবে কাদের জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা অন্য কর্মকর্তারা এখন আর সেই দায় স্বীকার করছেন না।

ওবায়দুল কাদের এক পর্যায়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রী যখন এই বিষয়ে কথা বলছিলেন, তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তিনি হারুনকে রক্ষা করার কোনো চেষ্টা করেননি, বরং এমন ভাব দেখাচ্ছিলেন যেন সব কাজ হারুন নিজেই করেছেন।

হারুন অর রশীদ ওবায়দুল কাদেরকে অনুরোধ করেন যেন তিনি দ্রুত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। হারুন আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে তাকে ডিবি থেকে সরিয়ে দেওয়ার আনুষ্ঠানিক আদেশ জারি হয়ে যাবে।

উল্লেখ্য যে, এই ঘটনার পর ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই হারুন অর রশীদকে ডিবি থেকে সরিয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে বদলি করা হয়েছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত অপরাধের মামলায় ওবায়দুল কাদেরসহ অন্যদের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন এই অডিও কথোপকথনটিকে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেছে।

হারুন-অর-রশিদ: স্যার অহন যদি ওনারা সাপোর্ট না দেয় আমারে, এহন হোম মিনিস্টার প্রধানমন্ত্রী বলতেছে, হোম মিনিস্টারকে বুদ্ধি করতে।

হারুন-অর-রশিদ: এখানে এখানে পিএমকে এসে কথা বুঝায় বলেন।

হারুন-অর-রশিদ: স্যার, আসসালামু আলাইকুম স্যার।

ওবায়দুল কাদের: তোমারে প্রত্যেকদিন বলতেছিলাম তুমি ভালো করতেছো।

হারুন-অর-রশিদ: না না এ খাওয়ার ডিসিশনটা কে দিছে স্যার?

আমার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আমার এসবির চিফ এরা দিছে খাওয়ায় নেওয়ার জন্য।

হারুন-অর-রশিদ: জ্বি স্যার জ্বি স্যার ছবি তোলা প্লাস হইলো ওই যে ডিবির দুইটা প্রকাশ্য, ছবি তোলা।

সব নির্দেশ কার কাছে নিয়া দিবা, এটা কেন?

হারুন-অর-রশিদ: না না ওনারা তো বলছে প্রকাশ করার জন্য স্যার।

মনির স্যারের, এসবি চিফ স্যারের জিজ্ঞাসা করেন স্যার, মনির স্যার বলছে কি না।

হোম মিনিস্টার হোম মিনিস্টার চেঞ্জ করতে হবে না?

ওবায়দুল কাদের: উল্টা তো তুমি দোষারোপ করে বসেছ।

হারুন-অর-রশিদ: স্যার হোম মিনিস্টার বলছে, তো পিএম পিএম নাকি বলছে।

হারুন-অর-রশিদ: ছয়জন তো স্যার এটা তো স্যার স্যার প্রতিদিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায় মিটিং হয়, প্রতিদিন।

ওবায়দুল কাদের: আমি বলছি যে ওই তুমি যাদেরকে ওখানে হেফাজতে রাখছো।

হারুন-অর-রশিদ: স্যার এটা তো এটা তো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার ওখানে মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত যা দেয় তাই করি।

এটা আমি স্বতস্ফূর্তভাবে তো করবো না তো।

হারুন-অর-রশিদ: স্যার এখন এখন স্যার এখন আমি এখন আমি যেটা বলি স্যার এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমারে কমিশনাররে বলে দিছে আমার বদলি করা লাগে।

সেও তো এমন ভাব দেখাচ্ছে যে তুমি নিজেই করো।

হারুন-অর-রশিদ: আমি স্যার আমরা যা করছি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইজিপির নির্দেশে করছি।

ওবায়দুল কাদের: আচ্ছা দেখি আমি দেখি আমি হোম মিনিস্টারের সাথে কথা বলি।

হারুন-অর-রশিদ: স্যার এটা এটা যদি অহন স্যার না করেন তাহলে কিন্তু অর্ডার এহন করে দিবে স্যার।