২০২৬ সালের এপ্রিলের প্রথম দিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে আভাস দিয়েছে সরকার। এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনি কার্যক্রম শুরু করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, এবারের নির্বাচনে বিদেশে বসবাসরত প্রায় ১ কোটি থেকে ১ কোটি ৪০ লাখ বাংলাদেশি কি তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন? প্রবাসীদের ভোটাধিকার সংক্রান্ত আইনি কাঠামো থাকলেও তার বাস্তব প্রয়োগ দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রবাসীরা বলছেন, তারা রেমিট্যান্স ও বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসলেও এর স্বীকৃতি মিলছে না। এবার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর যে পরিবর্তনের আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে, তারই অংশ হিসেবে তারা ভোট দিতে পারবেন বলে প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন তারা। বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন কমিশন ভবনের সভাকক্ষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে এসব কথা বলেন তিনি।
প্রবাসীদের ভোটাধিকার ও জনপ্রত্যাশা
যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিরা জানিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে রেমিট্যান্স ও বিনিয়োগ—সবক্ষেত্রেই প্রবাসীদের বিশাল অবদান রয়েছে। ২০২৬ সালের নির্বাচন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসীদের একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করার বড় সুযোগ। এলএসসিআই-এর চেয়ারম্যান এবং সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ ইউকে-র আহ্বায়ক নাসরুল্লাহ খান জুনায়েদ বলেন, সংবিধানে গ্যারান্টি থাকলেও প্রায় দেড় কোটি প্রবাসী বাংলাদেশির ভোটাধিকার ৫৫ বছর ধরে বাস্তবায়ন হয়নি। তারা বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৮ শতাংশ এবং প্রতিটি সংসদীয় আসনে গড়ে প্রায় ৫০ হাজার ভোটার হতে পারেন। ভারত, মালদ্বীপ ও ভুটানের মতো দেশগুলো প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করেছে, এমনকি কিছু দেশ সংসদে আসনও সংরক্ষণ করেছে।
অভিজ্ঞতায় প্রবাসীদের সংশয় ও দাবি
ইউকে বাংলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল ইসলাম বলেন, ওয়ান ইলেভেনের সময় সেনাসমর্থিত সরকার এ বিষয়ে উদ্যোগ নিলেও আইনি জটিলতায় তা বাস্তবায়ন হয়নি। পরে আইন পাস হলেও বিগত তিনটি নির্বাচন কমিশন কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। তিনি দাবি জানান, সব জটিলতা মোকাবিলা করে এবারের নির্বাচন থেকেই প্রবাসীদের ভোটাধিকার কার্যকর করা উচিত। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছি। তবু তাদের ভোটাধিকার নিয়ে এখনও নেই কোনও কার্যকর ব্যবস্থা।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা ও পদ্ধতি
নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে এবারের নির্বাচনে প্রবাসী বাংলাদেশিরা পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে পারবেন। তবে এই পদ্ধতিকে আরও আধুনিক করতে আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হচ্ছে। ভোটাররা এখন নিজ নিজ অবস্থান থেকে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ব্যালটের জন্য আবেদন করতে পারবেন। আগে ব্যালট রিটার্নিং অফিসারের কাছে পাঠিয়ে সময়ক্ষেপণ হতো, এখন সহকারী রিটার্নিং অফিসারের উপস্থিতিতে ব্যালট দ্রুত পাঠানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। তিনি বলেন, এখানে আমাদের একজন কমিশনারের কাছ থেকে আরেকটা সিদ্ধান্ত এসেছে, আমরা যদি সব মার্কা শুধু ছাপিয়ে দুই মাস আগেই পাঠিয়ে দেই এবং চূড়ান্ত মার্কাতে যদি শুধু ভোটটা দিয়ে পাঠিয়ে দেয়, তাহলে হয় কিনা। এই নির্বাচনই নির্ধারণ করবে, দেশ তার নাগরিকদের প্রতি তাদের অবস্থান নির্বিশেষে— গণতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে প্রস্তুত কিনা। আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে—যে ব্যালটটা পাঠানো হতো ভোটারের কাছে, সেটা প্রথমে রিটার্নিং অফিসারের কাছে যেতো তারপর তিনি পাঠাতেন।
প্রকল্প ও ব্যয় পরিকল্পনা
- পোস্টাল ব্যালটের গ্লোবাল ওয়েস্টেজ রেট প্রায় ২৪ শতাংশ, তবে বাংলাদেশের মতো বিস্তৃত ডায়েস্পোরার ক্ষেত্রে এটি ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
- টেকনিক্যাল কমিটি ব্যালট পাঠানোর প্রক্রিয়া রিভিউ করছে, যেখানে ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়া আরও সহজ করার জন্য সব প্রতীক ছাপিয়ে আগেই পাঠানোর প্রস্তাব রয়েছে।
- প্রবাসীদের ভোট নিশ্চিত করতে প্রাথমিকভাবে ৪৮ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।
- নির্বাচন কমিশন এবার প্রক্সি ভোট থেকে সরে এসেছে এবং পোস্টাল ব্যালটে ভোট আনতে প্রতি ভোটে প্রায় ৭০০ টাকা ব্যয় হবে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানানো হয়েছে, অনলাইন পদ্ধতির ট্রায়াল পর্যায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ইসি। পোস্টাল ব্যালটের সীমাবদ্ধতা দূর করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকারের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণে কমিশন এবার আগের চেয়ে বেশি আন্তরিক বলে দাবি করা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, আইনি কাঠামো ও আর্থিক প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভোটের দিন প্রবাসীরা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ পান কিনা।