গাজীপুরের কৃষি অর্থনীতিতে কাঁঠাল একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও, প্রতি মৌসুমে বিশাল এক অংশ পচে নষ্ট হওয়া ছিল দীর্ঘদিনের সমস্যা। এই সংকট নিরসনে শ্রীপুরের বৈরাগিরচালা গ্রামের উদ্যোক্তা আব্দুস ছাত্তার ভূঁইয়া এক উদ্ভাবনী পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি পাকা কাঁঠালের নির্যাস ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে বিস্কুট তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, যা স্থানীয়ভাবে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। ২০২৫ সালে জিআই (GI) পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়া গাজীপুরের কাঁঠালকে কেবল কাঁচা ফল হিসেবে নয়, বরং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য হিসেবে পরিচিত করার এই প্রচেষ্টা স্থানীয় পর্যায়ে নতুন কর্মসংস্থানের পথও প্রশস্ত করছে।
দীর্ঘদিন ধরে ভ্রমণপিয়াসী ছাত্তার ভূঁইয়া বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের সময় সেখানকার খাদ্যপ্রযুক্তি পর্যবেক্ষণ করেছেন। বিশেষ করে চীনে কাঁঠাল থেকে উৎপাদিত বিভিন্ন খাবারের জনপ্রিয়তা তাকে অনুপ্রাণিত করে। নিজের এলাকায় উৎপাদিত কাঁঠালের বিশাল অপচয় দেখে তিনি দেশে ফিরে পরীক্ষামূলকভাবে ‘মোমতাহিনা ফুড অ্যান্ড অয়েল মিলস’-এ এই গবেষণা শুরু করেন। ঘি, মাখন, দুধ ও ময়দার সাথে কাঁঠালের রসের সংমিশ্রণে প্রস্তুত এই বিস্কুট বর্তমান বাজারে ক্রেতাদের আগ্রহের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তিনি বর্তমানে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ কেজি বিস্কুট সরবরাহ করছেন এবং অনলাইনেও এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
তবে এই উদ্ভাবনী পণ্যের গুণগত মান ও বাণিজ্যিক প্রসারে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে। অনেক ক্রেতা বিস্কুটের স্বাদে মুগ্ধ হলেও মিষ্টতার আধিক্য এবং ভঙ্গুরতা নিয়ে মতামত দিয়েছেন। এছাড়া ৮৫০ টাকা কেজি দরের এই বিস্কুটের দাম কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন স্থানীয় ভোক্তারা। পণ্যের মান ও বাজারজাতকরণে শৃঙ্খলা আনতে বিএসটিআই-এর সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে। গাজীপুর বিএসটিআই জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি আবেদন করলে কাঁঠালভিত্তিক বিস্কুটের জন্য নতুন মানদণ্ড নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুরে প্রায় ৮,৫০২ হেক্টর জমিতে কাঁঠাল চাষ হয় এবং বছরে উৎপাদন হয় ২ লক্ষ ৫৭ হাজার ৫০৯ টন। শ্রীপুর উপজেলা এই উৎপাদনের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবলমাত্র বিস্কুট নয়, কাঁঠাল থেকে ড্রাই কেক, চিপস, জুস এবং প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্যপণ্য তৈরির মাধ্যমে একটি বড় শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব। গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. এমদাদুল হকের মতে, গবেষণালব্ধ জ্ঞান এবং উদ্যোক্তাদের সক্রিয়তা সমন্বয় করা গেলে কাঁঠাল ভিত্তিক এই শিল্প দেশের অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। সঠিক সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও মান নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা গেলে কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাতকরণের এই উদ্যোগ কেবল অপচয় রোধ করবে না, বরং কৃষকের মুখে হাসি ফোটাবে এবং দেশের রপ্তানি আয়ে নতুন পণ্য যুক্ত করবে।