যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই এবং আন্তর্জাতিক পুলিশ সহযোগিতা কেন্দ্রের (আইপিসিসি) ফাঁস হওয়া গোপন নথিপত্র থেকে জানা গেছে, গত ফিফা বিশ্বকাপ চলাকালীন বিশ্ব ফুটবলের মহাতারকা লিওনেল মেসিকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। টুর্নামেন্টের জমকালো আয়োজনের আড়ালে খেলোয়াড়, কোচ এবং রেফারিদের নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা ঝুঁকির মুখে ছিল, তা এই চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। স্পেনভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বমঞ্চের নিরাপত্তা নিয়ে যে আশঙ্কা করা হয়েছিল, বাস্তব পরিস্থিতি তার চেয়েও অনেক বেশি ভয়ংকর ছিল।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আর্জেন্টিনা অধিনায়ক লিওনেল মেসি টুর্নামেন্টজুড়ে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে ছিলেন। বিশেষ করে টেক্সাসের ডালাস বিমানবন্দরে আর্জেন্টিনা ও জর্ডান ম্যাচের দিন এক ব্যক্তি ফোন করে দাবি করেন যে, তিনি এবং তাঁর সহযোগীরা হাতে তৈরি বোমা ও এআর-১৫ সেমিঅটোমেটিক রাইফেল নিয়ে স্টেডিয়ামের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। তাদের মূল লক্ষ্য ছিলেন খোদ আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড লিওনেল মেসি। এছাড়া আর্জেন্টিনা ও মিসর ম্যাচের আগেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বোমাতঙ্কের সৃষ্টি হয়। এক ব্যবহারকারী আটলান্টা স্টেডিয়ামে শরীরে বোমা বেঁধে মেসিকে উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন। স্টেডিয়ামের ডাস্টবিনে বোমা রাখা হয়েছে—এমন সংবাদের পর বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল ও প্রশিক্ষিত কুকুর দিয়ে ব্যাপক তল্লাশি চালানো হয়।
শুধু মেসি নন, পর্তুগিজ তারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোও টুর্নামেন্টজুড়ে বিভিন্ন স্থানে হয়রানি ও নিরাপত্তার আশঙ্কার মুখোমুখি হন। ফিফা কর্মীর সতর্কবার্তার পর হিউস্টনে রোনালদোর হোটেল থেকে এক সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। কানাডা ও মায়ামিতেও রোনালদোর কাছাকাছি পৌঁছানোর চেষ্টা এবং মাঠে দর্শকের অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে, প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচের পর রিয়াল মাদ্রিদ তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পেকে ঘিরে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। প্যারাগুয়ের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে এমবাপ্পেকে নিয়ে কটূক্তি করা হয় এবং তাঁর প্রতিকৃতি পুড়িয়ে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
মাঠের পারফরম্যান্স, সহজ সুযোগ মিস করা কিংবা পেনাল্টি নেওয়ার মতো ঘটনায় খেলোয়াড় ও রেফারিদের ওপর নেমে আসে চরম হুমকি। আতলেতিকো মাদ্রিদের নরওয়েজীয় স্ট্রাইকার আলেকজান্ডার সরলথ গোল মিস করার পর তাঁর স্ত্রীকে পর্যন্ত মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। কলম্বিয়ার ফুটবলার জামিনটন ক্যাম্পাজ এবং ফরাসি ডিফেন্ডার লুকাস দিনিয়েও অনুরূপ হুমকির মুখে পড়েন। সবচেয়ে করুণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়া দলের জন্য, যাদের প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায়ের পর দলটিকে কড়া পুলিশ প্রহরায় বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌঁছে দিতে হয়েছিল।
হুমকির মাত্রা সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায় ম্যাচ পরিচালনাকারী রেফারিদের ক্ষেত্রে। আর্জেন্টিনা ও মিসরের মধ্যকার বিতর্কিত ম্যাচ পরিচালনা করায় ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ারের ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে প্রায় ছয় হাজার হুমকিমূলক বার্তা পাঠানো হয়, যার সিংহভাগই এসেছিল মিসরীয় নাগরিকদের কাছ থেকে। এছাড়া ভিএআর দায়িত্বে থাকা ফরাসি রেফারি উইলি দেলাজোদও মৃত্যুর হুমকি পান। পরিস্থিতি এতটাই জটিল রূপ নেয় যে ফ্রান্সে এই দুই রেফারির বাড়ি এবং তাঁদের পরিবারের সুরক্ষায় বিশেষ পুলিশি পাহারা বসাতে বাধ্য হয় প্রশাসন। এই চাঞ্চল্যকর তথ্যগুলো ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে খেলোয়াড় ও ম্যাচ অফিশিয়ালদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।