ভারতে তরুণ ও শিক্ষার্থীদের অভূতপূর্ব এক গণআন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে সরকার। আদালতের একটি বিতর্কিত মন্তব্য এবং চিকিৎসাবিদ্যার প্রবেশিকা পরীক্ষায় ব্যাপক জালিয়াতির জেরে গড়ে ওঠা এই বিক্ষোভের পর শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কেন্দ্র। একই সঙ্গে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জড়িতদের বিচারে বিশেষ আদালত গঠন এবং শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে। ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের এক শুনানিতে বেকার তরুণদের উদ্দেশ্য করে ‘ককরোচ’ বা ‘তেলাপোকা’ এবং ‘পরজীবী’ শব্দ দুটি ব্যবহার করার অভিযোগ ওঠে। যদিও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছিল যে, ভুয়া ডিগ্রি নিয়ে আইন পেশায় নাম লেখানো ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যেই ওই মন্তব্য করা হয়েছিল, তবে দেশের কোটি কোটি শিক্ষিত বেকার তরুণ বিষয়টি ভালোভাবে নেননি। বছরের পর বছর ধরে চাকরির সংকট ও অর্থনৈতিক স্থবিরতার মধ্যে লড়াই করা তরুণ সমাজ এই মন্তব্যকে তাদের জীবন সংগ্রামের প্রতি চরম অবমাননা হিসেবে বিবেচনা করে।
এই ক্ষোভ থেকে তরুণরা অনলাইন মাধ্যমে অভিনব উপায়ে প্রতিবাদ শুরু করে। শাসকদলের নামের আদলে ব্যঙ্গাত্মকভাবে তারা গঠন করে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। শুরুতে ব্যঙ্গ দিয়ে শুরু হলেও মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে এই সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মটি কোটি কোটি অনুসারী পেয়ে বিশাল এক জনভিত্তি গড়ে তোলে। বেকারত্ব এবং উচ্চশিক্ষার কাঠামোগত সংকটকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই অনলাইন প্ল্যাটফর্ম দেশের প্রচলিত রাজনীতিকে পেছনে ফেলে দেয়।
প্রকৃতপক্ষে, এই ক্ষোভের পেছনে ছিল দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মারাত্মক বিশৃঙ্খলা। চলতি বছরে জাতীয় পর্যায়ের অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস, মূল্যায়ন জালিয়াতি এবং অনিয়মের কারণে ২২ লাখেরও বেশি পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়। পরবর্তীতে পরীক্ষা বাতিল করে নতুন করে পরীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হলে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। এই মানবিক বিপর্যয় এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা সাধারণ ছাত্র-জনতার ক্ষোভকে চূড়ান্ত রূপ দেয়।
জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে এই আন্দোলন অনলাইনের গণ্ডি পেরিয়ে রাজপথে নেমে আসে। রাজধানী নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরসহ দেশের বিভিন্ন প্রধান নগরীতে হাজার হাজার ছাত্র ও চাকরিপ্রার্থী জড়ো হয়ে পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবি তোলেন। প্রথমদিকে সরকার এটিকে ‘বিদেশি চক্রান্ত’ আখ্যা দিয়ে কড়াকড়ি আরোপের চেষ্টা করে। ইন্টারনেট বন্ধ, গণসমাবেশ নিষেধাজ্ঞা এবং পুলিশি লাঠিচার্জ ও পেলেট বন্দুক ব্যবহারের মাধ্যমে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করা হলেও আন্দোলনকারীরা রাজপথ ছাড়েনি। পুলিশের হামলায় প্রায় ১৮০ জন আহত হলেও বিকেন্দ্রীকৃত এই যুব আন্দোলন আরও তীব্র রূপ নেয়।
দেশের তরুণ ও মধ্যবিত্ত ভোটারদের একটি বড় অংশ এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকায় এবং সার্বিক রাজনৈতিক ক্ষতি বিবেচনা করে শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করে কর্তৃপক্ষ। শিক্ষামন্ত্রীর বিদায় এবং বিশেষ বিচার ব্যবস্থার আশ্বাসকে দেশের সুশীল সমাজ ও বিশ্লেষকরা ভারতের অদম্য গণতান্ত্রিক চেতনার বড় জয় হিসেবে দেখছেন। বিশেষজ্ঞ ও রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, শুধু সংসদ বা আদালত নয়—প্রয়োজনে সংক্ষুব্ধ নাগরিকদের গণঅংশগ্রহণই যে গণতন্ত্রের মূল চালিকাশক্তি, ভারতের এই তরুণ আন্দোলন তা পুনর্বার প্রমাণ করল।