বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮৫তম প্রয়াণদিবসে সুর, ছন্দ ও নাট্যরসের এক অনন্য মেলবন্ধনে তাঁকে স্মরণ করেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট। ২২ শ্রাবণ সন্ধ্যায় ধানমন্ডির ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবন মিলনায়তনে পরিবেশিত হয় কবিগুরুর বিখ্যাত গীতিনাট্য ‘শ্যামা’। গভীর নাট্যবোধ আর কালজয়ী গানের সুষম সমন্বয়ে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানটি উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের হৃদয় গভীরভাবে স্পর্শ করে। প্রয়াণদিবসে এই বিশেষ পরিবেশনার মধ্য দিয়ে স্থানিক সীমানা ছাড়িয়ে বাঙালির আত্মিক সত্তায় বিরাজমান বিশ্বকবির অম্লান উপস্থিতিকেই যেন নতুন করে আবাহন জানানো হলো।
১৮৬১ সালে জন্মগ্রহণ করা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বিশ্বের দরবারে এক অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছেন। কবিতা, সংগীত, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, রূপক-গীতিনাট্য থেকে শুরু করে চিত্রশিল্প ও শিক্ষাভাবনায় তাঁর কালজয়ী অবদান আজও বাঙালির আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের প্রধান ভিত্তি। ১৯৪১ সালের ২২ শ্রাবণ বা ৭ আগস্ট এই মহান মনীষী চিরবিদায় নিলেও, তাঁর চিন্তা ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বাঙালির দৈনন্দিন জীবনচর্চায় সমানভাবে প্রাণবন্ত। জাতীয় সংকটে ও উদযাপনে কবির সৃষ্টি আজও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে রয়েছে।
ছায়ানটের এদিনের বিশেষ আয়োজনে মঞ্চস্থ গীতিনাট্য ‘শ্যামা’ মূলত কবির শেষ জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। মানবিক প্রেম, নৈতিক দায়িত্ব ও আত্মত্যাগের এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন ফুটে উঠেছে এই নাট্যকাহিনিতে। রাজদরবারের সুন্দরী নর্তকী শ্যামা ও বিদেশি বণিক বজ্রসেনের ভালোবাসাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় নাটকের মূল ঘটনা। মিথ্যা অপবাদে বন্দী বজ্রসেনকে মৃত্যুদণ্ড থেকে বাঁচাতে নির্দোষ যুবক উত্তীয় নিজের জীবন উৎসর্গ করে। কিন্তু পরবর্তীতে ভালোবাসার পেছনে এমন নির্মম আত্মত্যাগের সত্য উন্মোচিত হলে অনুশোচনা ও অপরাধবোধে জর্জরিত হয়ে পড়েন বজ্রসেন। ব্যক্তিপ্রেম ও নৈতিকতার এই দ্বন্দ্বই শ্যামাকে দিয়েছে এক চিরন্তন মানবিক আবেদন।
ছায়ানটের শিল্পীদের নিখুঁত পরিবেশনা ও গীতিনাট্যের সমবেত গান পুরো মিলনায়তনে সৃষ্টি করে এক বিশেষ নাট্য আবহ। ‘মায়াবনবিহারিণী হরিণী’, ‘ন্যায় অন্যায় জানি নে, জানি নে’, ‘আমার জীবনপাত্র উচ্ছলিয়া মাধুরী করেছ দান’ কিংবা ‘হায়, এ কী সমাপন!’-এর মতো অমর গানগুলো কাহিনির আবেগকে আরও গভীর ও সংবেদনশীল করে তোলে। ছায়ানটের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিল্পীদের স্পষ্ট উচ্চারণ ও সুরের ব্যঞ্জনা পরিবেশনাটিকে উচ্চমাত্রায় নিয়ে যায়।
এদিনের পরিবেশনায় শ্যামা চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় ও গায়কি পরিবেশন করেন মণীষা সরকার এবং বজ্রসেনের ভূমিকায় ছিলেন দীপ্র নিশান্ত। এছাড়া উত্তীয়র চরিত্রে সঞ্জয় বণিক, কোটালের ভূমিকায় অর্ণব বড়ুয়া ও বন্ধুর চরিত্রে ইনজামাম উল হোসাইন চমৎকার পারফর্ম করেন। গীতিনাট্যের নেপথ্য কথনে ছিলেন তানিয়া মান্নান। পুরো আয়োজনের সংগীত পরিচালনায় ছিলেন এ টি এম জাহাঙ্গীর এবং সার্বিক পরিকল্পনা ও নান্দনিক সজ্জার দায়িত্বে ছিলেন বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী ও নির্দেশক শর্মিলা বন্দ্যোপাধ্যায়।