সুরমা নদীর তীরে সিলেটের অন্যতম ঐতিহ্য ও পরিচয়ের স্মারক হিসেবে পরিচিত শতবর্ষী কিনব্রিজের সৌন্দর্য আড়াল করে নির্মিত ‘আই লাভ সিলেট’ নামের বিতর্কিত সাইনেজটি অবশেষে অপসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)। সাধারণ নাগরিকদের ক্ষোভ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সচিত্র প্রতিবেদনের মুখে নগর কর্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কিনব্রিজের দৃশ্যপট আড়ালমুক্ত করতে দ্রুতই সাইনেজটি ভেঙে অন্য কোনো উপযুক্ত স্থানে সরিয়ে নেওয়া হবে।
সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, নগরীর সার্কিট হাউসের বিপরীতে সুরমা নদীর উত্তর তীরে একটি উঁচু পাকা ভিত্তির ওপর আলোকসজ্জিত এই সাইনেজটি নির্মাণ করা হচ্ছিল। নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর লক্ষ্য করা যায়, এর অবয়ব কিনব্রিজের উত্তর পাশের একটি বড় অংশকে ঢেকে ফেলেছে। ফলে সিলেট নগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে খ্যাত ঐতিহাসিক সেতুটির দৃষ্টিনন্দন রূপ পথচারী ও দর্শনার্থীদের দৃষ্টিসীমা থেকে আড়াল হয়ে যায়। সাইনেজটিতে ‘আই লাভ সিলেট’ লেখার পাশাপাশি সিলেট সিটি করপোরেশন ও একটি বেসরকারি মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের লোগো যুক্ত ছিল।
ঐতিহাসিক কিনব্রিজকে আড়াল করে এমন অবকাঠামো নির্মাণের খবর ছড়িয়ে পড়তেই নাগরিক সমাজ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সচেতন নেটিজেন ও আলোকচিত্রীরা এই নির্মাণের কড়া সমালোচনা করেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, নগর সৌন্দর্যায়নের নামে সিলেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শনকে আড়াল করা এক ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। কোনো বাণিজ্যিক বা সৌন্দর্যবর্ধনমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে শহরের ঐতিহাসিক স্থানগুলোর ঐতিহ্য ও দৃষ্টিসীমা রক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। সামাজিক প্ল্যাটফর্মে তুমুল প্রতিবাদ এবং শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমে এসংক্রান্ত বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি দ্রুত সিটি করপোরেশন প্রশাসনের নজরে আসে।
বিতর্কের মুখে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে তিনি বিতর্কিত সাইনেজটি বর্তমান স্থান থেকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে সিসিক প্রশাসক জানান, ঐতিহ্য সংরক্ষণ সিটি করপোরেশনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। নগরের কোনো ঐতিহাসিক স্থাপনার নান্দনিকতা নষ্ট করে কোনো প্রকল্প রাখা হবে না। সাইনেজটি সরিয়ে অন্য একটি উপযুক্ত ও দৃষ্টিনন্দন স্থানে পুনর্স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে সেতুর দৃশ্যমানতা পুরোপুরি পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি নগর সৌন্দর্যায়নও বজায় থাকে।
উল্লেখ্য, ১৯৩৬ সালে সুরমা নদীর ওপর নির্মিত কিনব্রিজটি প্রায় ৯০ বছর ধরে সিলেটের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে টিকে রয়েছে। দীর্ঘ নয় দশক ধরে এটি দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। ঐতিহ্যপ্রেমীদের মতে, শহরের প্রাচীন এই স্থাপনাটির মৌলিক নকশা ও দৃশ্যমান পরিবেশ রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। সিটি করপোরেশনের এই দ্রুত পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে স্থানীয় সুশীল সমাজ প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে যে, ভবিষ্যতে নগরের যেকোনো অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও প্রচারণামূলক পরিকল্পনা গ্রহণের আগে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার গুরুত্ব ও সার্বিক দৃশ্যপট অক্ষুণ্ণ রাখার নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করা হবে।