জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে জীবন উৎসর্গকারী শহীদদের পরিবারকে সমবেদনা ও সহমর্মিতা জানানো এবং সংগ্রামে আহত ব্যক্তিদের সুচিকিৎসা সুনিশ্চিত করাকে বর্তমান সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেছেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, দৃষ্টিশক্তি কিংবা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হারানো অকুতোভয় জুলাই যোদ্ধাদের উপযুক্ত সম্মান ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া না হলে তা সমগ্র জাতির জন্য এক পরম লজ্জার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থান শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক আত্মত্যাগের বিনিময়ে দেশে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এক অভূতপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক, ইনসাফভিত্তিক ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলাই এই মুহূর্তে জাতির প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত, যেখানে প্রতিটি নাগরিক নিজের সমান অধিকার ও নিরাপত্তা ভোগ করবেন। নতুন বাংলাদেশের এই যাত্রাপথে রাজনৈতিক মতভিন্নতা থাকা স্বাভাবিক উল্লেখ করে তিনি দেশের সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রশ্নে সকলকে ঐক্য ও প্রজ্ঞার পরিচয় দেওয়ার আহ্বান জানান।
বক্তব্যে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের বিগত দেড় দশকের শাসনকালের তীব্র সমালোচনা করেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, খুন, গুম, নির্বিচারে নির্যাতন, অর্থপাচার এবং ‘আয়নাঘর’-এর মতো বিশ্ববেষ্টক অপকর্মের ভয়াবহ অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বিগত শাসকদলের মধ্যে ন্যূনতম কোনো অনুশোচনা বা অনুতাপ দেখা যাচ্ছে না। নিজের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করে ৮২ বছর বয়সী এই অভিজ্ঞ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও প্রাক্তন সেনাকর্মকর্তা পুনর্ব্যক্ত করেন যে, প্রয়োজনে দেশের স্বাধীনতা ও গণমানুষের অধিকার রক্ষার জন্য তিনি আবারও লড়াই করতে প্রস্তুত।
অনুষ্ঠান চলাকালে প্রদর্শিত প্রামাণ্যচিত্রে গণ-অভ্যুত্থানের প্রধান প্রতীক শহীদ আবু সাঈদ এবং বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ছবি অন্তর্ভুক্ত না থাকায় মিলনায়তনে উপস্থিত ছাত্র-জনতার প্রতিবাদ ও হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় গভীর দুঃখ ও মর্মাহত হওয়ার কথা জানিয়ে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, যেকোনো জাতীয় প্রামাণ্যচিত্রে আবু সাঈদের মতো বীরের অবদান বাদ দিলে তা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আন্তর্জাতিক অতিথিদের সামনে এ ধরনের বিশৃঙ্খলা দেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করে এবং এর সুবিধা প্রতিবেশী দেশে অবস্থানরত বিরোধী শক্তির অনুকূলে যায় বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে ভুলত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়ে সবাইকে একত্রিত হয়ে জাতীয় ঐক্যের পথ উন্মুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
একই দিনে সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কর্তৃক ‘জুলাই জাদুঘর’ উদ্বোধনের প্রসঙ্গ টেনে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সরকারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক শিষ্টাচারের প্রশংসা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী যেভাবে প্রবীণ অর্থনীতিবিদ ও সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে সম্মান প্রদর্শন করে নিজ পাশে বসিয়েছেন, সেটিই আমাদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সংস্কৃতির আদর্শ হওয়া উচিত। শহীদ আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিম, ফারহান, নাফিজসহ হাজারো বীর শহীদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি নিশ্চিত করেন যে, বীর সন্তানদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই গণতন্ত্র কোনোভাবেই হাতছাড়া হতে দেওয়া হবে না।