চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলায় শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানির অভাবে প্রতি বছর হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমি পতিত থাকে, যা স্থানীয় কৃষকদের জন্য এক গভীর সংকটের কারণ। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ সরকার এবং জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)-এর যৌথ অর্থায়নে প্রায় ১৩ লক্ষাধিক টাকা ব্যয়ে একটি সরকারি সেচ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। ২০২৩ সালে এই প্রকল্পের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলেও, এটি এক দিনের জন্যও চালু হয়নি। ফলে কৃষকদের দীর্ঘদিনের পানির হাহাকার রয়ে গেছে এবং সরকারি অর্থ অপচয় হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পের পাম্প অচল অবস্থায় পড়ে আছে এবং এর মূল্যবান বৈদ্যুতিক তারও চুরি হয়ে গেছে, যা পুরো প্রকল্পের উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

সন্দ্বীপ উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্পের (ইউজিডিপি) আওতায় সন্দ্বীপ উপজেলা প্রশাসন এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে। কালাপানিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্য কালাপানিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় এর স্থাপনা গড়ে তোলা হয়। প্রকল্পের ফলকে স্পষ্টতই ‘কৃষি সেচের জন্য শাখা নালাসহ গভীর নলকূপ স্থাপন’ করার উদ্দেশ্য উল্লেখ করা আছে। এই প্রকল্পের জন্য প্রাথমিকভাবে মোট ১৪ লক্ষ ৮৫ হাজার ৮৬ টাকা বরাদ্দ করা হলেও, ব্যয় দেখানো হয়েছে ১৩ লক্ষ ৩৯ হাজার ২৬১ টাকা। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এই পুরো প্রকল্পের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে ছিল। বিপুল অঙ্কের সরকারি অর্থ ব্যয়ের পরও কৃষকদের কোনো উপকার না হওয়ায় সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে মধ্য কালাপানিয়া এলাকা পরিদর্শন করে দেখা যায়, গভীর নলকূপের পাম্পটি একটি জনশূন্য স্থানে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। পাম্পটিকে কেন্দ্র করে প্রায় ১০ একর জমির সেচ সুবিধার জন্য তৈরি করা পাকা শাখা নালাগুলোও দীর্ঘকাল ধরে অব্যবহৃত। এসব নালায় পানি প্রবাহের কোনো চিহ্ন নেই; বরং আগাছা জন্মে অনেক অংশ ভরাট হয়ে গেছে, যা প্রমাণ করে যে সেচ সুবিধা কখনো চালু হয়নি। পাম্পঘরটিও তালাবদ্ধ ও অযত্নে পড়ে রয়েছে এবং পাম্পের লোহার পাইপগুলোতে মরিচা ধরতে শুরু করেছে। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, পাম্পের বৈদ্যুতিক সংযোগের তার চুরি হয়ে যাওয়ায় এটিকে চালু করার সামান্য সম্ভাবনাও বর্তমানে নেই। আশপাশের কৃষিজমিতে সেচ সুবিধার কোনো চিহ্নও দেখা যায়নি, যা কৃষকদের হতাশার গভীরতা আরও বাড়িয়ে তোলে।

স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম (৫৮) এই প্রতিবেদককে জানান, “এই প্রকল্প আমাদের কৃষকদের কোনো কাজে আসেনি। কাজ শেষ হওয়ার পর থেকে এক দিনের জন্যও এই পাম্প চালানো হয়নি। আমরা ভেবেছিলাম, এটি আমাদের সেচের অভাব পূরণ করবে, কিন্তু সবই মিথ্যা প্রমাণিত হলো। এখন এটির বৈদ্যুতিক তারও চুরি হয়ে গেছে, ফলে এটি চালু হওয়ার আর কোনো সম্ভাবনা নেই।” তিনি আরও যোগ করেন, এই ধরনের সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে যখন কৃষকরা বঞ্চিত হন, তখন তাদের জীবিকা ও কৃষি উৎপাদন চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রতি বছর সন্দ্বীপে শুষ্ক মৌসুমে অন্তত ২২ হাজার হেক্টর কৃষিজমি সেচের অভাবে পতিত থাকে, যার ফলে হাজারো কৃষক ডালজাতীয় ফসল চাষে বাধ্য হন, যার জন্য কম পানির প্রয়োজন হয়।

প্রকল্পের নির্মাণ কাজ সমাপ্তির পর এটিকে চালু রাখা, নিয়মিত পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কে নেবে, তা নিয়ে এক চরম অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। কৃষকরা অভিযোগ করেছেন যে, কোনো কর্তৃপক্ষই এই প্রকল্পের তদারকির দায়িত্ব নিতে এগিয়ে আসেনি। সন্দ্বীপ উপজেলা প্রশাসনও এটিকে সচল করার জন্য কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি, যার ফলস্বরূপ প্রায় তিন বছর ধরে প্রকল্পটি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে এবং এর অবকাঠামো নষ্ট হচ্ছে। স্থানীয় জনগণের প্রশ্ন, যখন সন্দ্বীপের মতো একটি কৃষিপ্রধান এলাকায় সেচের তীব্র সংকট বিদ্যমান, তখন ১৩ লক্ষাধিক টাকার একটি সরকারি সেচ প্রকল্প কীভাবে দীর্ঘকাল ধরে অচল পড়ে থাকতে পারে? কেন এটি চালু করা হলো না এবং এতদিন এর তদারকির দায়িত্বে কে ছিল, আর এই ব্যর্থতার জন্য কার কাছে জবাবদিহি চাওয়া হবে?

প্রকল্পটির তদারকির দায়িত্বে থাকা উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি)-এর কাছেও এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য নেই। সন্দ্বীপ উপজেলা প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম এক প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন যে, এই প্রকল্পের বিষয়ে তার কাছে কোনো তথ্য নেই। অন্যদিকে, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মারুফ হোসেন জানিয়েছেন যে, প্রকল্পটি কৃষি বিভাগের অধীন না হলেও সন্দ্বীপে সেচের তীব্র সংকট রয়েছে এবং এই প্রকল্পের সুফল কৃষকদের কাছে পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি। তিনি আরও নিশ্চিত করেছেন যে, বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নজরে আনা হয়েছে। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের মধ্যে এই সমন্বয়হীনতা এবং দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা সরকারি প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নে বড় বাধা সৃষ্টি করছে, যার ফলে জনগণের অর্থ অপচয় হচ্ছে এবং প্রকৃত উপকারভোগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন।

১৩ লাখ টাকার একটি সরকারি সেচ প্রকল্পের এমন বেহাল দশা কেবল অর্থের অপচয় নয়, এটি জনগণের প্রতি অবহেলা এবং সরকারি কার্যক্রমে আস্থা হারানোর একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, কেবল প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেই হবে না, বরং এর সঠিক পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করাও অত্যাবশ্যক। সন্দ্বীপের কৃষি খাতের উন্নয়নের জন্য এবং সরকারি অর্থের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে অবিলম্বে এই প্রকল্পের সামগ্রিক পরিস্থিতি তদন্ত করা উচিত। একই সাথে, দায়ীদের চিহ্নিত করে জবাবদিহিতার আওতায় আনা এবং দ্রুততম সময়ে সেচ পাম্পটি সচল করে কৃষকদের দোরগোড়ায় পানির সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। অন্যথায়, সন্দ্বীপের কৃষকদের হাহাকার চলতেই থাকবে এবং সরকারের জনহিতকর উদ্দেশ্য কেবল অপচয় হয়েই থেকে যাবে।