ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের অত্যন্ত পরিচিত মুখ এবং আমির খান অভিনীত আলোচিত সিনেমা ‘গজনি’র ভয়ংকর খলনায়ক হিসেবে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করা প্রবীণ অভিনেতা প্রদীপ সিং রাওয়াত আর নেই। রক্তের ক্যানসারের সঙ্গে দীর্ঘ ও কঠিন লড়াই শেষে মঙ্গলবার ৭৪ বছর বয়সে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর এই প্রয়াণে ভারতীয় বিনোদন অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং ভক্তরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের প্রিয় অভিনেতার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন।

অভিনেতার মৃত্যুর এই সংবাদটি নিশ্চিত করেছেন তাঁর দীর্ঘদিনের ব্যবস্থাপক সিদ্ধার্থ তিওয়ারি। ভারতীয় গণমাধ্যমকে তিনি জানান, কিছুদিন আগে প্রদীপ রাওয়াতের শরীরে ক্যানসার পুনরায় বাসা বাঁধে এবং অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রায় এক মাসেরও বেশি সময় ধরে তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন। চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টা এবং উন্নত চিকিৎসা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত বার্ধক্য ও অসুস্থতার কাছে হার মেনে না ফেরার দেশে চলে যান এই গুণী অভিনেতা। প্রদীপের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই সহকর্মী ও চলচ্চিত্র নির্মাতারা শোকবার্তা পাঠাতে শুরু করেন। অভিনেতা যশপাল শর্মা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করে লিখেছেন, ‘গজনি’ ও ‘লগান’ খ্যাత প্রদীপ রাওয়াত, শান্তিতে ঘুমাও।

১৯৫২ সালের ২১ জানুয়ারি ভারতের মধ্যপ্রদেশের জবলপুরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন প্রদীপ সিং রাওয়াত। তাঁর অভিনয়জীবন শুরু হয়েছিল ছোট পর্দা বা টেলিভিশনের মাধ্যমে। বি আর চোপড়ার অত্যন্ত জনপ্রিয় ও কালজয়ী পৌরাণিক ধারাবাহিক ‘মহাভারত’-এ মহাবীর অশ্বত্থামার চরিত্রে অভিনয় করে তিনি রাতারাতি ভারতের ঘরে ঘরে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। ছোট পর্দার সফল যাত্রার পর তিনি বড় পর্দায় পা রাখেন এবং ধীরে ধীরে নিজেকে ভারতীয় সিনেমার অন্যতম শক্তিশালী খল অভিনেতা হিসেবে শক্ত অবস্থানে নিয়ে যান।

১৯৮৫ সালে ‘এতবার’ চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে বড় পর্দায় তাঁর অভিষেক ঘটে। এরপর নব্বইয়ের দশকে ‘অগ্নিপথ’, ‘কয়লা’, ‘সরফরোশ’ এবং ‘মেজর সাব’-এর মতো ব্যবসাসফল ও প্রশংসিত ছবিতে খল চরিত্রে অভিনয় করে তিনি নিজের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করেন। তবে তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট আসে ২০০১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত আশুতোষ গোয়ারিকরের অস্কার মনোনীত ছবি ‘লাগান’র মাধ্যমে, যেখানে তিনি ‘দেবা সিং সোধি’র মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয় চরিত্র রূপায়ন করেছিলেন। এরপর ২০০৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এ আর মুরুগাদোস পরিচালিত ও আমির খান অভিনীত ‘গজনি’ সিনেমায় নির্মম ও ভয়ংকর খলনায়ক ‘গজনি ধর্মাত্মা’ চরিত্রটিতে অভিনয় করে তিনি বিশ্বজুড়ে অসামান্য জনপ্রিয়তা লাভ করেন। এর আগে ২০০৫ সালে সূর্য অভিনীত তামিল ভাষার মূল ‘গজনি’ সিনেমাতেও তিনি একই খলচরিত্রে অভিনয় করে দক্ষিণ ভারতীয় দর্শকদের মন জয় করেছিলেন।

হিন্দি চলচ্চিত্রের পাশাপাশি দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতেও তাঁর সমান দাপট ও জনপ্রিয়তা ছিল। তেলেগু ছবি ‘সাই’-এর মাধ্যমেই মূলত দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রে তাঁর দুর্দান্ত যাত্রা শুরু হয় এবং সেখানে অসাধারণ অভিনয়ের সুবাদে তিনি মর্যাদাপূর্ণ ‘ফিল্মফেয়ার’ পুরস্কার অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে ‘রাউডি রাঠোর’ এবং ‘বাঘি’-এর মতো অসংখ্য হাই-প্রোফাইল কমার্শিয়াল চলচ্চিত্রে তাঁর শক্তিশালী অভিনয় সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায়। চার দশকেরও বেশি দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি হিন্দি, তেলেগু, তামিল এবং নেপালিসহ বিভিন্ন ভাষার এক শতাধিক চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ধারাবাহিকে অভিনয় করেছেন।

পর্দায় তাঁর বলিষ্ঠ উপস্থিতি, গম্ভীর কণ্ঠস্বর এবং নির্মম খলচরিত্রের নিখুঁত রূপায়ন তাঁকে ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে অমর করে রেখেছে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি নিয়মিত অভিনয় চালিয়ে গেছেন। তাঁর সর্বশেষ মুক্তিপ্রাপ্ত কাজগুলোর মধ্যে ভিকি কৌশল অভিনীত ঐতিহাসিক ড্রামা ‘ছাভা’, তেলেগু চলচ্চিত্র ‘গায়াপাড্ডা সিমহাম’ এবং নেপালি ছবি ‘আ বাটা আমা’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি স্ত্রী ও পুত্র বিক্রমাদিত্যকে রেখে গেছেন। চলচ্চিত্র সমালোচক ও সহকর্মীদের মতে, ক্যামেরার সামনে তিনি যতই ভয়ংকর ও নিষ্ঠুর খলনায়কের চরিত্রে অভিনয় করুন না কেন, বাস্তব জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, মার্জিত ও আন্তরিক একজন মানুষ। তাঁর অনন্য অভিনয়শৈলী এবং চলচ্চিত্রশিল্পে অসামান্য অবদান ভক্তদের হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে।