বাসাবাড়িতে তীব্র গ্যাস-সংকট, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি এবং গ্যাস বিতরণকারী সংস্থাগুলোর ভুতুড়ে বিল আদায়ের প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন’ (এনপিএ)। মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অবস্থিত তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের প্রধান কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে একটি গণবিক্ষোভ সমাবেশ আয়োজন করে সংগঠনটি। বক্তারা বাসাবাড়িতে নিয়মিত গ্যাস সরবরাহ না থাকা সত্ত্বেও মাস শেষে পূর্ণাঙ্গ বিল আদায়কে ‘রাষ্ট্রীয় চাঁদাবাজি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং সাধারণ গ্রাহকদের স্বার্থরক্ষায় দ্রুত সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়ার জোরালো দাবি জানান।
বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে দেশের সার্বিক জ্বালানি খাতের বিরাজমান অব্যবস্থাপনা ও নৈরাজ্য দূর করতে একটি ১২ দফা দাবি ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মটির একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বরাবর এসব দাবিসংবলিত স্মারকলিপি প্রদান করে। স্মারকলিপিতে বাসাবাড়িতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভুক্তভোগী গ্রাহকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য একটি সুস্পষ্ট ‘গ্রাহক ক্ষতিপূরণ নীতি’ প্রণয়নের দাবি জানানো হয়েছে। এছাড়া বিলে স্বচ্ছতা ফেরাতে দেশের সব আবাসিক গ্যাস সংযোগে অবিলম্বে ডিজিটাল স্মার্ট মিটার স্থাপনের আহ্বান জানানো হয়।
ঘোষিত ১২ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—প্রয়োজনীয় গ্যাস ও বিদ্যুৎ না পেয়েও বিল পরিশোধে বাধ্য হওয়া গ্রাহকদের আইনি সুরক্ষায় ক্ষতিপূরণ নীতি চালু করা, তিতাসের সকল আবাসিক গ্রাহকের জন্য ডিজিটাল স্মার্ট মিটার বাধ্যতামূলক করা, যে কোনো ধরনের মনগড়া ও ভৌতিক বিল বাতিল করে গ্যাসের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করা এবং ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধি না করা। পাশাপাশি এলপিজি বা সিলিন্ডার গ্যাসের কৃত্রিম সংকট তৈরি ও চড়া দাম নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সরকারের তদারকি জোরদার করার দাবি জানানো হয়। এছাড়া দেশে বৈদ্যুতিক রান্নাবান্না (ইলেকট্রিক কুকিং) ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি খাতে তথাকথিত ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’-এর নামে অনিয়ম ও অর্থ অপচয় বন্ধ করে নিরপেক্ষ শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবিও তুলে ধরা হয়।
জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা সুসংহত করতে এনপিএ-র পক্ষ থেকে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানকারী প্রতিষ্ঠান ‘বাpex’-কে দ্রুত শক্তিশালী ও গতিশীল করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আমদানিনির্ভর এলএনজি কৌশলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব স্থলভাগ ও বিস্তৃত সমুদ্রসীমায় জমা থাকা প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ অনুসন্ধানে জোর তৎপরতা চালানোর ওপর তাগিদ দেন আন্দোলনকারীরা। আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর ঝুঁকি কমাতে এলএনজি টার্মিনালের পরিধি বাড়ানো, নতুন উৎস থেকে গ্যাস আমদানির সুযোগ তৈরি এবং অন্তত এক বছরের আগাম গ্যাস সরবরাহ ও মজুদের সার্বিক রূপরেখা প্রণয়নের দাবি জানানো হয়। অন্যদিকে, তিতাসের পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ সঞ্চালন লাইন সংস্কার ও আধুনিকায়নের পাশাপাশি কখন কোথায় গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে, তা গ্রাহকদের আগাম জানানোর বাধ্যবাধকতা তৈরির প্রতিও আলোকপাত করা হয়।
সমাবেশে বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার সাশ্রয়ী ও ধারাবাহিক বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের অঙ্গীকার করলেও সাধারণ মানুষ আজ চরম সংকটের শিকার হচ্ছেন। দৈনন্দিন রান্নাবান্নার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়ে সাধারণ নাগরিকরা এলপিজি সিলিন্ডারের চড়া দামে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। এনপিএ-র কেন্দ্রীয় কাউন্সিল সদস্য কৌশিক আহমেদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এ প্রতিবাদ সভায় আরও বক্তব্য প্রদান করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতা অনিক রায়, সেতু আরিফ এবং মুখপাত্র নাজিফা জান্নাত। সমাবেশ থেকে অবিলম্বে ১২ দফা দাবি বাস্তবায়নের জোর দাবি জানানো হয়।