২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে রাজধানী ঢাকার মতোই সমানভাবে উত্তাল হয়ে উঠেছিল দেশের পূর্বাঞ্চলীয় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেলা কুমিল্লা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়া এই জেলায় সেসময় হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে এসেছিলেন। সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনটি পরবর্তীতে ফ্যাসিবাদের পতন ও শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের এক দফায় রূপ নেয়। সেই অগ্নিগর্ভ দিনগুলোতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের সশস্ত্র সমর্থকদের নৃশংস দমন-পীড়নের মুখেও দমে যাননি কুমিল্লার অকুতোভয় তরুণরা। বুক চিতিয়ে গুলির সামনে দাঁড়িয়ে বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধের নতুন অধ্যায় রচনা করেছিলেন তারা।
আন্দোলন পণ্ড ও দমন করতে সেসময় কুমিল্লা শহর ও এর আশেপাশের কৌশলগত পয়েন্টগুলোতে চালানো হয়েছিল মারাত্মক ক্র্যাকডাউন। বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোটবাড়ী বিশ্বরোড এলাকা, টমসন ব্রিজ, কান্দিরপাড় এবং পুলিশ লাইনস সংলগ্ন এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর মুহুর্মুহু টিয়ারশেল, কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও তাজা ছররা গুলি বর্ষণ করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, মহাসড়ক অবরোধ কর্মসূচি ভণ্ডুল করতে পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর অতিমাত্রায় বলপ্রয়োগের ফলে পুরো এলাকা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। দফায় দফায় ঘটে যাওয়া রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রাজপথ রঞ্জিত হয় বহু আন্দোলনকারীর রক্তে, যেখানে প্রাণ হারিয়েছেন অনেকে এবং আহত হয়েছেন শত শত শিক্ষার্থী।
জুলাইয়ের সেই রক্তঝরা দিনগুলোতে কুমিল্লায় বহু তরুণ ও সাধারণ মানুষ চিরতরে হারিয়েছেন তাদের স্বাভাবিক জীবন। চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আন্দোলন চলাকালে ছররা গুলির স্প্লিন্টার চোখে প্রবেশ করায় অনেক শিক্ষার্থীর চোখের আলো চিরতরে নিভে গেছে। শুধু কুমিল্লা জেনারেল হাসপাতাল ও কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই নয়, মারাত্মক আহতদের জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় স্থানান্তর করেও বহু চেষ্টা সত্ত্বেও অনেকের দৃষ্টিশক্তি রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। অনেকে অঙ্গহানি ও পঙ্গুত্ব বরণ করে শরীরে বুলেটের স্থায়ী ক্ষতচিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছেন। প্রিয়জনকে হারিয়ে এখনো বহু পরিবার শোকে কাতর, আবার কেউ বা পঙ্গু হয়ে পরিবারের বোঝা হওয়ার দুঃসহ কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।
গণ-অভ্যুত্থানের পর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও কুমিল্লায় সেই ভয়াল জুলাইয়ের ট্রমা তাড়া করে বেড়াচ্ছে বেঁচে যাওয়া ও পঙ্গুত্ব বরণ করা মানুষদের। শারীরিকভাবে গুরুতর ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকেই আজ আর স্বাভাবিক কাজকর্মে ফিরতে পারছেন না। অনেক দরিদ্র পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বা সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীটি মারাত্মক শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়ে চরম ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। ভুক্তভোগীদের সুচিকিৎসা, স্থায়ী রাষ্ট্রীয় পুনর্বাসন এবং দৃষ্টিশক্তি হারানো ব্যক্তিদের বিশেষ সহায়তার পাশাপাশি সেই সময়ে ঘটে যাওয়া সকল হিংসাত্মক ঘটনা ও হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচারে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের জোর দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয় অধিবাসী ও সচেতন সমাজ।
সর্বস্তরের জনগণের অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ এবং বীর তরুণদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে কুমিল্লায় গণ-আন্দোলনের যে রক্তস্নাত ইতিহাস রচিত হয়েছিল, তা দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে। দেশের অর্জিত এই পরিবর্তনের পেছনে যাদের রক্ত ও শারীরিক সক্ষমতা বিসর্জন দিতে হয়েছে, তাদের ত্যাগের সঠিক মূল্যায়ন করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।