সুনামগঞ্জের বিশ্ব ঐতিহ্য ও অনন্য জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ রামসার সাইট টাঙ্গুয়ার হাওরে পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড রোধ এবং পর্যটন শিল্পে শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষিত সংরক্ষিত অঞ্চলে অবৈধভাবে প্রবেশ এবং পরিবেশদূষণের অভিযোগে ছয়টি পর্যটকবাহী হাউসবোটের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরসহ আর্থিক জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। যৌথভাবে পরিচালিত এ বিশেষ অভিযানে অভিযুক্ত বোটগুলোকে মোট ১৮ হাজার ৫০০ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়।

জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে গত মঙ্গলবার বিকেলে টাঙ্গুয়ার হাওরের বিভিন্ন সংবেদনশীল পয়েন্টে এ ঝটিকা অভিযান চালানো হয়। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাকিবুর রহমান উপস্থিত থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন। অভিযানে পরিবেশ অধিদপ্তর সুনামগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের পরিদর্শক সাইফুল ইসলামসহ তাহিরপুর থানা পুলিশের একটি চৌকস দল প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেয়। নিয়ম ভেঙে ইসিএ অঞ্চলে চলাচল করা এবং পরিবেশ বিনষ্টকারী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ মেলায় তাৎক্ষণিকভাবে নৌযানগুলোর বিরুদ্ধে এ আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

অভিযান পরিচালনাকালে কেবল জরিমানা আদায় নয়, বরং হাওরে আসা দর্শনার্থী, বোট চালক ও পরিচালনাকারীদের মধ্যে পরিবেশ সুরক্ষামূলক নানা দিকনির্দেশনা সংবলিত লিফলেট বিতরণ করা হয়। উল্লেখ্য, এর আগে গত রবিবার টাঙ্গুয়ার হাওরের নাজুক পরিবেশ, বিলুপ্তপ্রায় জীববৈচিত্র্য ও প্রতিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার তাগিদে ১৩ দফা জরুরি নির্দেশনা জারি করেছিল সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন। এসব নির্দেশনায় হাউসবোট ও অন্যান্য ট্রলারের বাধ্যতামূলক নিবন্ধন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়। মঙ্গলবারের এ অভিযান ছিল মূলতঃ সেই নির্দেশনাবলী বাস্তবায়নেরই ধারাবাহিক অংশ।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার আধার টাঙ্গুয়ার হাওর ১৯৭১ সালের রামসার কনভেনশন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন জলাভূমি হিসেবে স্বীকৃত। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ সরকার হাওরটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন, উচ্চ শব্দে মাইক বা সাউন্ড বক্স বাজানো এবং হাউসবোটের বিষাক্ত প্লাস্টিক ও বর্জ্য সরাসরি পানিতে ফেলার কারণে হাওরের জলজ প্রাণী, বিরল প্রজাতির মাছ ও অতিথি পাখির অস্তিত্ব মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছিল। স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে হাওরের প্রকৃতি রক্ষায় কার্যকর নজরদারির দাবি জানিয়ে আসছিল।

এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মোহাইমিনুল হক জানান, রামসার সাইটের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও ইকো-সিস্টেম টিকিয়ে রাখা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। হাওরের জীববৈচিত্র্য ক্ষুণ্ণ করে কোনো প্রকার অনিয়মিত পর্যটন ব্যবসায় ছাড় দেওয়া হবে না। জেলা প্রশাসন কর্তৃক ঘোষিত ১৩ দফা নির্দেশনার আলোকে আগামী দিনগুলোতেও হাওর এলাকায় এ ধরনের তদারকি ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান নিয়মিত চালিয়ে যাওয়া হবে।