ভারত মহাসাগরের নীল জলরাশিতে মাতৃত্বের এক হৃদয়স্পর্শী ও বেদনাবিধুর দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছেন সমুদ্র গবেষক ও নাবিকেরা। সন্তানের প্রতি মায়ের মমত্ববোধ যে কেবল মানবজাতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, তা ফের প্রমাণ করল এক মা ডলফিন। নিজের মৃত শাবককে পিঠে ভাসিয়ে টানা ছয় দিন ধরে মহাসাগরে সাঁতার কেটে চলেছে এই মা ডলফিনটি। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, একা নয়, এই দুঃখজনক যাত্রায় মা ডলফিনটির পাশে দলবদ্ধভাবে পাহারা দিয়ে চলেছে আরও ১৪টি সঙ্গিনী ডলফিন।
সামুদ্রিক পরিবেশবিদ ও গবেষকদের মতে, এ ধরনের আচরণ সামুদ্রিক প্রাণীদের গভীর আবেগ ও শোক প্রকাশের এক বিরল দৃষ্টান্ত। প্রাপ্ত পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, মা ডলফিনটি তার মৃত সন্তানকে পানির ওপরে ভাসিয়ে রাখার জন্য অবিরত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ডলফিনদের এই বিশেষ আচরণকে প্রাণীবিজ্ঞানের ভাষায় ‘এপিমেলেটিক বিহেভিয়ার’ বা সহানুভূতিশীল পরিচর্যামূলক আচরণ বলা হয়ে থাকে। মা ডলফিনটি যাতে ক্লান্ত হয়ে কোনো বিপদে না পড়ে এবং শিকারি প্রাণীর আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়, সে জন্য দলের অন্যান্য ১৪টি ডলফিন তাকে সার্বক্ষণিক বেষ্টন করে রেখেছে।
প্রাণীবিজ্ঞানীরা জানান, তিমি ও ডলফিন জাতীয় সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীদের (সিটাসিয়ান) মধ্যে আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা অত্যন্ত প্রখর। সন্তান হারালে এরা মানুষের মতোই তীব্র শোক অনুভব করে। অতীতেও মহাসাগরে ওরকা বা ডলফিনের ক্ষেত্রে মৃত সন্তানকে দিন ধরে বয়ে বেড়ানোর নমুনা পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, স্তন্যপায়ী প্রাণী হওয়ার কারণে ডলফিনের মস্তিষ্কের লিম্বিক সিস্টেম বেশ উন্নত, যা এদের ভালোবাসা, দুঃখ এবং সহানুভূতির অনুভূতি তৈরিতে সাহায্য করে।
ভারত মহাসাগরে চিত্রায়িত এই ঘটনাটি ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। গবেষকরা বর্তমানে ডলফিন দলের গতিপথ পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রেখেছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা একই সঙ্গে সমুদ্রে ক্রমবর্ধমান প্লাস্টিক দূষণ, জাহাজ চলাচলের শব্দ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সামুদ্রিক প্রাণীদের অকালমৃত্যুর হার বৃদ্ধি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অনেক গবেষকের আশঙ্কা, পরিবেশগত বিপর্যয় বা বিষাক্ত পদার্থের প্রভাবের কারণেও শাবকটির অকালমৃত্যু ঘটে থাকতে পারে।
মাতৃত্বের এই অনন্য আবেগ এবং সমুদ্রের বুকে ডলফিন দলের এমন পারস্পরিক সহমর্মিতা প্রকৃতির এক অপরূপ বার্তা বহন করে। বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণে নতুন করে বিশ্ববাসীকে সচেষ্ট হতে উদ্বুদ্ধ করবে।