শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলজুড়ে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা কয়েকদিনের অতিভারী বর্ষণে পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে বিস্তীর্ণ জনপদ, আর ভূমিধসের আশঙ্কায় জারি করা হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কতা বা ‘রেড অ্যালার্ট’। দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র (ডিএমসি) জানিয়েছে, প্রতিকূল আবহাওয়ায় এখন পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন এবং বেশ কয়েকজন নিখোঁজ থাকার খবর পাওয়া গেছে।

স্থানীয় গণমাধ্যম ও সরকারি সূত্র অনুযায়ী, কলম্বো, কালুতারা, রত্নপুরা এবং গলে জেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কেলানি, কালু ও নিলওয়ালা নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নিম্নাঞ্চলগুলো পুরোপুরি তলিয়ে গেছে। অনেক স্থানে ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট পানির নিচে চলে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদগুলোতে সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অনেক এলাকায় টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থাও সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

উদ্ধার অভিযানে পূর্ণ শক্তিতে নেমেছে শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী, সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনী। দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন জরুরি সেবাকর্মীরা। নৌবাহিনীর বিশেষ ডুবুরি দল ও স্পিডবোটের মাধ্যমে দুর্গম এলাকা থেকে শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের উদ্ধার করে উঁচু স্থানে নিয়ে আসা হচ্ছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য দেশটির বিভিন্ন স্কুল ও সরকারি ভবনে সাময়িক আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে সরকার ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার পক্ষ থেকে খাবার, পানি ও জরুরি চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

এদিকে, শ্রীলঙ্কার ন্যাশনাল বিল্ডিং রিসার্চ অর্গানাইজেশন (এনবিআরও) জানিয়েছে, পাহাড়ি জেলাগুলোতে ভূমিধসের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। বিশেষ করে রত্নপুরা ও কেগালে জেলায় পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত শত শত পরিবারকে অবিলম্বে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অতিবৃষ্টির কারণে মাটির গঠন আলগা হয়ে যাওয়ায় যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের ধসের আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা জনবসতির ওপর বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

আবহাওয়া দপ্তরের সর্বশেষ পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা বৃষ্টির তীব্রতা কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। ভারত মহাসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদরা। সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া সাধারণ মানুষকে অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের না হওয়ার এবং নদী তীরের বাসিন্দাদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্রগুলোতে এখন অসময়ে অতিবৃষ্টি ও বন্যার প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে গেছে। শ্রীলঙ্কার এই বর্তমান প্রাকৃতিক বিপর্যয় মূলত সেই দীর্ঘমেয়াদী জলবায়ু পরিবর্তনেরই এক নেতিবাচক প্রতিফলন। বর্তমানে উদ্ধারকাজের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হলেও, পানি নেমে যাওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্তদের দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন এবং ভেঙে পড়া অবকাঠামো মেরামত করা দেশটির অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।