কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার মসূয়া ইউনিয়নের কাজীর চর এলাকায় পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের শাখা আড়িয়াল খাঁ নদের তলদেশে তিতাস গ্যাসের উচ্চ চাপের সঞ্চালন পাইপলাইনে বড় ধরনের ছিদ্র তৈরি হয়েছে। প্রায় দেড় মাস ধরে এই ছিদ্র দিয়ে অনবরত গ্যাস নির্গত হলেও তা প্রতিকারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস বাতাসে মিশে যাওয়ার পাশাপাশি নদীপাড়ের গোটা এলাকায় তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। গ্যাস নির্গমনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে। নিরাপত্তার স্বার্থে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড কিশোরগঞ্জ জেলাজুড়ে সাময়িকভাবে গ্যাস সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে, যার ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন শহরের প্রায় নয় হাজার আবাসিক গ্রাহক।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত জুন মাসের শুরুর দিকে মসূয়া ইউনিয়নের কাজীর চর এলাকায় সুনামগঞ্জের ছাতকের দেলোয়ার হোসেন তালুকদার নামের এক ব্যক্তি কোনো ধরনের সরকারি অনুমোদন ছাড়াই একটি অবৈধ চুন কারখানা স্থাপন করেন। অভিযোগ রয়েছে, কারখানার মালিক স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির সহযোগিতায় রাতের আঁধারে নদের তলদেশে থাকা তিতাসের মূল উচ্চচাপ সঞ্চালন লাইন থেকে অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ নেওয়ার অপচেষ্টা চালান। ওই সময় বৃষ্টির কারণে কাজ পুরোপুরি শেষ করা না গেলেও পাইপলাইনের একাংশে মারাত্মক ছিদ্র তৈরি হয়। প্রথমে বুদ্বুদ আকারে সামান্য গ্যাস বের হলেও পরবর্তীতে তা ফোয়ারার মতো উথলে উঠতে শুরু করে। ঘটনা ধামাচাপা দিতে চোরকাঁটা ও কচুরিপানা দিয়ে স্থানটি আড়াল করার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু সম্প্রতি গ্যাসের চাপ বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় বিষয়টি প্রকাশ পায় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কারখানা ফেলে পালিয়ে যান।
দীর্ঘ দেড় মাস ধরে গ্যাস বের হওয়ার বিষয়টি স্থানীয়ভাবে জানাজানি হলেও তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও চরম উদাসীনতার অভিযোগ উঠেছে। মসূয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু বক্কর স্বীকার করেছেন যে, শুরুতে গ্যাসের নির্গমন কম থাকায় বিষয়টি নিয়ে তারা গুরুত্ব দেননি। পরবর্তীতে গ্যাসের চাপ ও তীব্রতা বৃদ্ধি পেলে বিষয়টি কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) অবহিত করা হয়। কটিয়াদীর ইউএনও শামীমা আফরোজ মারলিজ জানান, তিনি ঘটনার পাঁচ দিন আগে বিষয়টি জানার পরপরই তিতাস কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নদীর পাড়ে লোকজনের চলাচল নিষিদ্ধ করেন। এছাড়া অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ওই চুন কারখানার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেছেন।
এদিকে গত ৯ জুলাই তিতাসের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেও দৃশ্যমান কোনো মেরামত কাজ শুরু করতে দীর্ঘ সময় ক্ষেপণ করা হয়। বর্তমানে কিশোরগঞ্জ তিতাস গ্যাসের আঞ্চলিক বিক্রয় কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক মো. মোশাররফ হোসেনের তত্তাবধানে মেরামতের কাজ চললেও পাইপটি নদীর অন্তত আট ফুট গভীরে থাকায় এবং পানির তীব্র স্রোতের কারণে ব্যাপক জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে। কাজ শুরু করতে গেলে গর্তে বালু জমে যাওয়ায় ছিদ্র বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। ঝুঁকি এড়াতে সঞ্চালন লাইনের মোট নয়টি ভালভের ৯০ শতাংশই বন্ধ রাখা হয়েছে, যার কারণে কিশোরগঞ্জ শহরজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। তিতাসের ময়মনসিংহ বিভাগের সিস্টেম অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স শাখার ব্যবস্থাপক মো. শামীম হোসেন জানিয়েছেন, তথ্য প্রাপ্তিতে বিলম্ব এবং কারিগরি জটিলতার কারণেই মেরামতে দেরি হয়েছে।
গ্যাস সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় কিশোরগঞ্জ শহরের ৯ হাজার আবাসিক গ্রাহক চরম রান্নাবান্না ও গৃহস্থালি সংকটে পড়েছেন। শহরের সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, একদিকে দেশজুড়ে যখন জ্বালানি সংকট চলছে, তখন এভাবে অবহেলার কারণে কোটি কোটি টাকার গ্যাস বাতাসে মিলিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান খালেদ সাইফুল্লাহ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, তিতাস কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলা ও উদাসীনতার কারণে এই বিপর্যয় ঘটেছে এবং এর দায় কোম্পানিকে অবশ্যই নিতে হবে। অবিলম্বে ঘটনার সুনির্দিষ্ট ও নিরপেক্ষ তদন্ত সাهم সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন তিনি।