স্থানীয় সরকারমন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মন্তব্য করেছেন যে, বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতারা ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতোই ভাষা ব্যবহার করছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৯০-এর দশকে শেখ হাসিনা যেমন বলতেন ‘এক দিনের জন্যও শান্তিতে থাকতে দেব না’ বা ‘পাঁচ বছর সরকার চালাতে দেব না’, তেমনি আজকের বিরোধী দলগুলোও একই ধরনের নেতিবাচক বক্তব্য দিচ্ছে। সোমবার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের’ দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) যৌথভাবে এই সভার আয়োজন করে।

মির্জা ফখরুল বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ‘জুলাই সনদ’ পুরোপুরি বাস্তবায়নে কাজ করছে এবং এর অংশ হিসেবে জাতীয় সংসদে কমিটিও গঠন করা হয়েছে। তিনি বিরোধীদের প্রতি আহ্বান জানান, ‘সংস্কার’ নাকি ‘সংশোধন’—এই ধরনের শব্দগত বিতর্ক বা অন্য যেকোনো ইস্যুতে রাজপথে সংঘাতের পথ পরিহার করে সংসদে এসে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজতে। বিএনপির মহাসচিব আরও বলেন, গণতন্ত্রকে মজবুত করতে বিরোধী দলের গঠনমূলক সমালোচনা অপরিহার্য, তবে তা সংসদীয় রীতিনীতির মধ্যে থাকা উচিত। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, রাজপথের প্রতিবাদ যেন কোনোভাবেই সহিংস রূপ না নেয়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলো যথাযথভাবে তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে সরকারের কথিত ব্যর্থতা নিয়ে ছড়ানো ‘গুঞ্জন’কে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেন। তিনি দাবি করেন, বিএনপিই দেশের ইতিহাসে বারবার রূপান্তর ও সংস্কার নিয়ে এসেছে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার ‘জুলাই সনদের’ প্রতিশ্রুতি পূরণে ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছে। মির্জা ফখরুল আঠারো বছরের দীর্ঘ ‘ফ্যাসিবাদের জঞ্জাল’ সরিয়ে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার আহ্বান জানান। তার মতে, দীর্ঘ সংগ্রাম, বহু রক্তপাত এবং ‘জুলাই অভ্যুত্থানের’ পর জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে নির্বাচিত এই সরকার দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্র সংস্কারে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি আশ্বস্ত করেন যে, বর্তমান সরকার সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় কোনো হস্তক্ষেপ করছে না। বরং, সাংবাদিকদের কর্মসংস্থান, আবাসন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্দোলনে শহীদ সাংবাদিক এবং অন্যান্য নাগরিকদের পরিবারের দেখভাল নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, অসংখ্য রক্ত ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে যে সংসদ গঠিত হয়েছে, সেটিকেই দেশের রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু করা উচিত। ‘জুলাই শহীদদের’ প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য কেবল আবেগ নয়, বরং সংসদকে কার্যকর করা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে উন্নত করাই প্রধান মানদণ্ড হওয়া উচিত। তথ্যমন্ত্রী সম্প্রতি রাজনীতির চর্চাকে কৃত্রিমভাবে সংসদের বাইরে নিয়ে যাওয়ার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করার কথা জানান। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অশালীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত চর্চা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে সকল গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।

বিএফইউজের মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী তার মূল প্রবন্ধে বলেন, ২০২৪ সালের ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান’ দীর্ঘ ১৬ বছরের স্বৈরশাসন, নির্যাতন ও দুর্নীতির অবসান ঘটিয়েছে। এখন দেশের লক্ষ্য একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক বাংলাদেশ গড়া, যেখানে বাক্‌স্বাধীনতা, সুশাসন ও মেধার মূল্যায়ন থাকবে। তিনি বলেন, ‘আয়নাঘর’ বা গুম-খুন থাকবে না এবং বিচার বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ। শিক্ষা ও চিকিৎসার পাশাপাশি সর্বস্তরে সমান অধিকার নিশ্চিত হবে। তিনি মন্তব্য করেন, এই রক্তের ঋণ তখনই শোধ হবে, যখন অর্জিত স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র অক্ষুণ্ন থাকবে। বিএফইউজের সভাপতি ওবায়দুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের মানুষ ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান’কে ভুলবে না, ভুলতে পারবে না। তিনি সতর্ক করেন যে, যারা এই অর্জনকে ভুলিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, তারা জানে না যে জনগণ তাদেরই ভুলিয়ে দেবে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত সব ভেদাভেদ ভুলে দেশের জন্য কাজ করা এবং ‘জুলাইয়ের’ চেতনাকে ধারণ করা। ডিইউজের সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, গত ১৫ বছর ধরে শেখ হাসিনাকে ফ্যাসিবাদী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে যেসব গণমাধ্যম ভূমিকা রেখেছিল, তারা আবার পুরোনো ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তিনি ষড়যন্ত্রে লিপ্ত গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ ‘জুলাইকে’ জাতির অহংকার উল্লেখ করে বলেন, ‘জুলাই-পরবর্তী’ বিভিন্ন কোন্দল ও সংকটে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে যে অনৈক্য সৃষ্টি হয়েছে, তা যেন নতুন সংকট ডেকে না আনে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। শহীদ তাহির জামান প্রিয়র মা সামসী আরা জামান বলেন, গণতান্ত্রিক স্বার্থে সমালোচনা জরুরি, তবে সেই সমালোচনা যেন কাউকে আঘাতের পর্যায়ে নিয়ে না যায়। নতুন বাংলাদেশে সবার এমনটাই প্রত্যাশা। আলোচনা সভাটি সঞ্চালনা করেন ডিইউজের সাধারণ সম্পাদক খুরশীদ আলম। এতে আরও বক্তব্য দেন দৈনিক যুগান্তর সম্পাদক আবদুল হাই শিকদার, তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমেদ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি এলাহী নেওয়াজ খান এবং দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ সম্পাদক মারুফ কামাল খান সোহেল প্রমুখ।