দিনাজপুরের ফুলবাড়ী থেকে নিখোঁজ হওয়ার ছয় দিন পর নোয়াখালীর মাইজদী থেকে আরাফাত রহমান (১৪) নামের এক স্কুলছাত্রকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। গত শনিবার রাতে এক বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাকে উদ্ধার করা হয়। তবে অভিযانের সময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে আলমগীর হোসেন নামের মূল অভিযুক্ত পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। ভুক্তভোগী আরাফাত নীলফামারীর সৈয়দপুরের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ব্রাহ্মণ বড়ুয়া গ্রামে হলেও তার পরিবার বর্তমানে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার রাজারামপুরে একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করছে।
পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ২৬ জুলাই বিকেলে ছুটি শেষে হোস্টেলে ফেরার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল আরাফাত। বাসস্ট্যান্ডে যাওয়ার জন্য একটি রিকশায় ওঠার পরই বিপত্তি ঘটে। রিকশাচালক তার নাক ও মুখে চেতনানাশক ওষুধ স্প্রে করে তাকে অজ্ঞান বা সম্মোহিত করে ফেলে। এরপর থেকে তার কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না এবং তার মুঠোফোনটিও বন্ধ পাওয়া যায়। পরিবারের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজাখুঁজির পর কোনো সন্ধান না পেয়ে গত ২৮ জুলাই আরাফাতের বাবা জামাত আলী ফুলবাড়ী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডির পর নড়েচড়ে বসে পুলিশ এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত শুরু করে।
তদন্তে নেমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানতে পারে, এটি কোনো সাধারণ নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নয়, বরং একটি সংঘবদ্ধ চক্রের অপহরণের শিকার হয়েছে শিশুটি। চক্রটি তাকে চেতনানাশক ওষুধ দিয়ে অবশ করে প্রথমে চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে নিয়ে যায়। সেখানে কিছুটা জ্ঞান ফিরলেও শিশুটি মানসিকভাবে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত ও স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল। পরবর্তীতে তাকে আলমগীর হোসেন নামের এক টুপি বিক্রেতার হাতে তুলে দেওয়া হয়। আলমগীর প্রথমে তাকে কুমিল্লা এবং পরবর্তীতে ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে তার নিজের ভাড়া বাসায় নিয়ে যান। সেখানে শিশুটির ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
তদন্তের এক পর্যায়ে আরাফাতের বন্ধ থাকা মুঠোফোনের টাওয়ার লোকেশন ও ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট ট্র্যাক করে পুলিশ মূল সূত্র খুঁজে পায়। ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে আলমগীরের বাসায় অভিযান চালিয়ে তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং পুলিশ জানতে পারে যে অভিযুক্ত ব্যক্তি আরাফাতকে নিয়ে নোয়াখালীর উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। এই তথ্যের ভিত্তিতে নোয়াখালীর মাইজদী এলাকায় জেলা স্কুল মাঠসংলগ্ন পদচারী-সেতুর নিচে থাকা অস্থায়ী দোকানগুলোতে নজরদারি শুরু করে পুলিশ। শনিবার রাতে একটি টুপির দোকান থেকে আরাফাতকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তবে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ভিড়ের সুযোগ নিয়ে পালিয়ে যান আলমগীর হোসেন।
উদ্ধারের পর আরাফাতকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হলেও সে এখনো চরম মানসিক ট্রমা ও ভীতির মধ্যে রয়েছে বলে জানিয়েছেন তার বাবা জামাত আলী। ঘটনার পর ফুলবাড়ী থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। পুলিশ জানিয়েছে, পালিয়ে যাওয়া অভিযুক্ত আলমগীর হোসেনকে দ্রুত গ্রেপ্তারের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। শিশু অপহরণের মতো এমন জঘন্য অপরাধের সাথে জড়িত অন্যান্য চক্রের সদস্যদেরও আইনের আওতায় আনতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।