দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে চলা ঐতিহ্যবাহী রংপুর বিভাগের শেষ প্রান্তের একমাত্র সিনেমা হল ‘শাপলা টকিজ’ আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গত শুক্রবার থেকে হলটির মালিকপক্ষ ও ব্যবস্থাপনা কতৃপক্ষের যৌথ সিদ্ধান্তে এর কার্যক্রম চিরতরে গুটিয়ে নেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে উত্তরবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগীয় শহর রংপুরে বড় পর্দার চলচ্চিত্র প্রদর্শনের বর্ণাঢ্য যুগের পুরোপুরি অবসান ঘটল।

শনিবার হলটির সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা মোড. শাহাবুদ্দিন গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ১৯৭৮ সালের ১৬ জুন যাত্রা শুরু করা শাপলা টকিজ দীর্ঘ সময় ধরে রংপুরের মানুষের বিনোদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। মূল প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবসায়ী মাসুম মিয়ার মৃত্যুর পর এর মালিকানায় নানা হাতবদল ঘটে। ২০০৬ সাল থেকে প্রযোজক কামাল হোসেন ভাড়ায় হলটি পরিচালনা করে আসছিলেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দর্শক খরা এবং আর্থিক লোকসানের পাশাপাশি হল প্রাঙ্গণে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুতর অভিযোগ ওঠায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে বেশ কয়েকজন তরুণ-তরুণী আপত্তিকর অবস্থায় আটক হওয়ার পর মালিকপক্ষ তীব্র নৈতিক সংকটে পড়ে। পরে রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার ভিত্তিতে ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, দুই দশক আগেও রংপুর শহর ও এর আশপাশের উপজেলাগুলোতে ওরিয়েন্টাল, লক্ষ্মী টকিজ, সেনা অডিটোরিয়াম, শাপলা টকিজ, দরদী হলসহ ডজনেরও বেশি সিনেমা হল জমজমাটভাবে চালু ছিল। ব্রিটিশ আমলের ‘রংপুর ড্রামাটিক’ যা পরবর্তীতে ‘মডার্ন হল’ ও বর্তমান ‘টাউন হল’ হিসেবে পরিচিত, সেখানেও একসময় নিয়মিত সিনেমা প্রদর্শিত হতো। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির বিকাশ, পাইরেসি, স্যাটেলাইট টেলিভিশন এবং সর্বোপরি হলের পরিবেশ অবনতিশীল হওয়ার কারণে সাধারণ দর্শকরা মুখ ফিরিয়ে নেন। একে একে বন্ধ হয়ে যায় ওরিয়েন্টাল, লক্ষ্মী টকিজের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রদর্শনী কেন্দ্রগুলো। সর্বশেষ শাপলা টকিজও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রংপুর বিভাগের এই প্রধান শহরে এখন আর বড় পর্দায় সিনেমা উপভোগ করার কোনো সুযোগ রইল না। চলচ্চিত্র বোদ্ধা ও সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিরা মনে করছেন, প্রেক্ষাগৃহগুলোর এই করুণ পরিণতি দেশের সামগ্রিক চলচ্চিত্র শিল্প ও সুস্থ বিনোদনের ওপর এক বিরাট দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।