মিসরের বন্দরে ড্রোন হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুয়েজ খাল এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত জ্বালানি পাইপলাইনের নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মার্কিন মালিকানাধীন দুটি গ্যাস ট্যাংকারে সংঘটিত এই হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার আঁচ এখন মিসরের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি এবং লোহিত সাগরের বাব আল-মানদেব প্রণালিতে সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প রুটগুলোও যখন একের পর এক বিঘ্নিত হচ্ছে, ঠিক তখনই এই নতুন নিরাপত্তা সংকট বিশ্ববাজারকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

চলমান ইরান যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন প্রায় পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো তাদের তেল রপ্তানি সচল রাখতে লোহিত সাগর এবং সুমেদ পাইপলাইনের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছিল। লোহিত সাগর থেকে শুরু হয়ে মিসরের বুক চিরে ভূমধ্যসাগরের সিদি কেরির বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত এই পাইপলাইন এবং সুয়েজ খাল বর্তমানে সৌদি তেল উত্তরের বাজারে পাঠানোর প্রধান বিকল্প রুট। তবে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের নতুন হুমকি এবং সাম্প্রতিক ড্রোন হামলার পর ট্যাংকার চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বাজার বিশ্লেষক ও জ্বালানি খাতের গবেষকরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ সরাসরি হুমকির মুখে পড়তে পারে।

জ্বালানি বিশ্লেষণকারী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি বাব আল-মানদেব প্রণালিতে হুতিদের আক্রমণ ও কড়া নজরদারির কারণে অনেক তেলবাহী জাহাজ এখন বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে। এশিয়ার গ্রাহকদের জন্য এর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এডেন উপসাগর হয়ে দক্ষিণ দিকের সংক্ষিপ্ত ও ঐতিহ্যবাহী পথ এড়িয়ে জাহাজগুলোকে এখন পুরো আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। এর ফলে পণ্য পরিবহনে যেমন অতিরিক্ত এক মাস সময় বেশি লাগছে, তেমনি জাহাজ ভাড়া ও বিমা খরচ বহুগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে যুদ্ধঝুঁকি প্রিমিয়াম বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যের দাম বাড়ানোর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, যার চূড়ান্ত খেসারত দিতে হবে সাধারণ ভোক্তাদের।

যদিও সুয়েজ খালের মূল অবকাঠামো এখনো সরাসরি হামলার শিকার হয়নি এবং মিসরীয় কর্তৃপক্ষ ও বিশ্লেষকদের মতে খালটির নিরাপত্তা এখনো কঠোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তবুও নিকটস্থ বন্দরে হামলার ঘটনা সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। অনেক কোম্পানি ইতিমধ্যে তাদের জাহাজের গতিপথ ও নিরাপত্তা প্রোটোকল পুনর্বিবেচনা শুরু করেছে। সুয়েজ খালের কার্যক্রমে সামান্য বিঘ্ন ঘটলে বা বিকল্প এই রুটটিও বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের মূল্যস্ফীতির ধাক্কা আসতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের এই জ্বালানি করিডোর রক্ষা করা বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।